অনেকের মধ্যেই এধরণের চিন্তাভাবনা এসেছে যে, "ঠিক আছে বুঝলাম গনতন্ত্র হারাম, শরিয়াহ' প্রয়োজন কিন্তু এটি তো সুইচ টেপার মতো সহজ কাজ নয়। এরজন্য প্রয়োজন সময়, শ্রম, মেধা, অধ্যবসায় আরও বহু কিছু৷ আজ বললাম আর কালকের মধ্যেই তো শরিয়াহ' আসবে না। তাহলে যেকয়দিন না আসে, সেকয়দিন তো ঠিকভাবে বাঁচা লাগবে, এরজন্যও তো কম জুলুম করা দল বা ইসলামি দল কে ভোট দিয়ে এটলিস্ট ইসলাম প্রচারের জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারি"।
.
এধরণের প্রশ্ন খুব কমন এবং যৌক্তিক। আদতে এসবের উত্তর কি? চলুন এক এক করে জানা যাক।
.
প্রথম ভুল:- প্রথমেই সমস্যার সৃষ্টি হয় “মন্দের ভালো” ধারণা থেকে। ইসলামে নৈতিকতা তুলনামূলক নয়, নীতিগত। হারাম কখনো “কম হারাম” হয়ে হালাল হয়ে যায় না।
.
কেউ যদি হেকমতের দোহাই দিয়ে বলে, “শুধু একদিনের জন্য”, “শুধু এই পরিস্থিতিতে” তাহলে সে আসলে হারামকে সময়ের ওপর নির্ভরশীল বানাচ্ছে।
.
অথচ শরিয়াহতে হারাম সময়নিরপেক্ষ। সূদ আজও হারাম, যুদ্ধের দিনেও হারাম, দুর্ভিক্ষেও হারাম। হারাম ইজ হারাম৷ কারণ হারামের সমস্যা ফলাফলে নয়, পদ্ধতিতে।
.
দ্বিতীয় ভুল:- অনেকেই ধরে নেয় যে, ভোট দিলে ফল ভালো হবে, কোনো ইসলামি দল কে ভোট দিলে হয়তো দেশে ইসলাম কিছুটা হলেও আসবে। কিছু বিষয় আসলেও আসতে পারে কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভোট দেওয়া মানে শুধু ফল বেছে নেওয়া না; ভোট দেওয়া মানে একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া।
.
গণতন্ত্রে ভোট দেয়ার মানে হলো স্বীকার করে নেওয়া যে, সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে, আইন বানাবে সংসদ, হালাল-হারাম নির্ধারণ করবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কেউ যদি বলে, “আমি বেশি খারাপের চেয়ে কম খারাপকে আনছি”, তাহলে তারা একই সাথে বলছে, এই সিস্টেমটাই বৈধ।
.
তৃতীয় ভুল:- অনেকের মধ্যেই বদ্ধ ধারণা জন্মেছে যে, " আমরা যদি ভোট না দেই কোনো ভালো দল না লোক কে কিংবা ইসলামি দল কে, তাহলে মন্দ লোকেরা, ফ্যাসিস্ট লোকেরা গদিতে বসবে"। অথচ ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, সবচেয়ে শক্ত ফ্যাসিবাদী শাসনগুলোই এসেছে গণতন্ত্রের ভোট দিয়েই। বহু স্বৈরাচার আসে “কম খারাপ” স্লোগান নিয়ে। সুতরাং মনে রাখতে হবে ভোট ≠ নিরাপত্তা। বরং ভোটের মাধ্যমে মানুষ নিজের হাতেই জুলুমকে বৈধতা দেয়।
.
চতুর্থ ভুল:-" যদি ইসলামি দল কে না আনি বা ভালো দলকে ভোট না দেই তখন ইসলামের কথা বলা যাবে না”—এধরণের আবেগীয় যুক্তি তোলে অনেকে কিন্তু তারা হয়তো ভুলে যায় ইসলাম কখনো রাষ্ট্রের অনুমতির ওপর টিকে ছিলো না।
.
মক্কায় কি ইসলাম নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি ছিলো? ছিল না। তবু দাওয়াত কি বন্ধ হয়ছিলো? হয়নি কিন্তু। বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ক্ষমতার সাথে আপস করলেই দাওয়াত মারা যায়। আর আপস না করলে হয়তো নিপীড়ন আসে, কিন্তু দ্বীন বিশুদ্ধ থাকে। ইসলাম টিকে আছে ত্যাগ দিয়ে, কৌশলী সমঝোতা দিয়ে নয়।
.
ফলাফলের ভয় দিয়ে নীতিকে বিসর্জন দেওয়া ইসলামের মানহাজ না। আল্লাহ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন সঠিক অবস্থান নেওয়ার, ফলাফলের মালিক তিনি। আমাদের কাজ দাওয়াত, ইদাদ ও জি-*হাদ। আমাদের কাজ চেষ্টা করে যাওয়া, জীবিত অবস্থায়ই খিলাফত আসলে তো আলহামদুলিল্লাহ নাহলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে আল্লাহর সাহায্যে ও ইচ্ছায় খিলাফতের ঝান্ডা আল্লাহর জমিনে উড়াবে৷
.
যদি ভুল পথে গিয়ে ভালো ফল আসতো, তাহলে চট্রগ্রামে যাওয়ার গাড়ি ময়মনসিংহ গিয়েও চট্রগ্রামে পৌঁছাতো।
.
সুতরাং সমস্যাটা এই না যে “শরিয়াহ একদিনে আসবে না”। সমস্যাটা হলো—ভুল রাস্তায় হাঁটলে হাজার দিনেও সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। মন্দের ভালো বেছে নেওয়া আসলে ভালো বেছে নেওয়া না, বরং মন্দকে স্বাভাবিক করে তোলা।
.
সুতরাং আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখানো পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাওয়া। দ্বীন ঠিকই একদিন এই জমিনে প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু দেখতে হবে আমি সেই প্রতিষ্ঠার জন্য শরিক ছিলাম কি-না।
©হাসান মোহাম্মদ মেহেদী ভাই