অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন—এত সুন্দর, নিরিবিলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, লাক্সারি, ভালো ফ্যাসিলিটি এবং সাথে সুন্দর মুসলিম কমিউনিটি, ঘরের সাথে মাসজিদ আর দ্বীনের পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও এখান থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে এতটা সিরিয়াস!!!?
সত্যি বলতে, এর উত্তর দেওয়ার মতো বড় কোনো জ্ঞান আমার নেই।
দ্বীন সম্পর্কে আমার জ্ঞানও খুবই সামান্য। যতটুকু একাডেমিকভাবে শিখেছি, শুনি, পড়ি, বুঝি—সেখান থেকে যে কথাগুলো অন্তরে দাগ কাটে, সেগুলোই নিজের জন্য মনে রাখি, আর কখনো কখনো অন্যদের সঙ্গেও শেয়ার করি।
আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খুব সহজ হিসাব।
দ্বীনকে যখন একটু একটু করে ভালোবাসতে শুরু করবেন, তখন দেখবেন—দ্বীনের জন্য কিছু জিনিসকে অগ্রাধিকার দিতে নিজের ভেতর থেকেই ইচ্ছা হচ্ছে।
তখন প্রশ্নটা আর শুধু থাকে না—
“কোথায় জীবন বেশি আরামদায়ক?”
“কোথায় বাড়ি সুন্দর?”
“কোথায় চিকিৎসা ভালো?”
“কোথায় শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো?”
“কোথায় খাবারে ভেজাল কম?”
“কোথায় বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ বেশি উজ্জ্বল?”
এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমিও এগুলোর মূল্য বুঝি।
কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন এসে যায়—
আমার ঈমানের ভবিষ্যৎ কী?
আমার সন্তানদের ঈমানের ভবিষ্যৎ কী?
তারা কোন পরিবেশে বড় হবে?
ঘর থেকে বের হলে তারা কী দেখতে দেখতে বড় হবে?
তাদের কাছে কোন জিনিসটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে?
আমার সন্তানদের সন্তানরা—আমার পরবর্তী প্রজন্ম—কোন পরিচয় নিয়ে বড় হবে?
এই প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবায়।
কারণ আমি চাই না, আমার সন্তান শুধু ভালো স্কুলে পড়ুক, ভালো চাকরি করুক, ভালো জীবন পাক।
আমি চাই, তারা আল্লাহকে চিনুক।
আল্লাহকে ভালোবাসুক।
আল্লাহকে ভয় করুক।
আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শিখুক।
হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝুক।
লজ্জা, শালীনতা, আমানতদারি ও মানুষের হক বুঝুক।
আর এজন্য পরিবেশের একটা বড় ভূমিকা আছে—এটা আমি যতটুকু বুঝেছি, ততটুকুই বলছি।
যে পরিবেশে নামাজ সহজ,
যেখানে মাসজিদ মাদ্রাসা সহজে পাওয়া যায়,
যেখানে সন্তানদের জন্য ইসলামিক শিক্ষা ও ভালো সঙ্গ পাওয়া যায়,
যেখানে চারপাশে দ্বীন মেনে চলা মানুষ দেখা যায়,
যেখানে সন্তানদের কাছে মুসলিম পরিচয়টা স্বাভাবিক ও জীবন্ত একটা বিষয়— তারা কোনো অস্বস্তিতে পড়বে না, সেই পরিবেশ আমার কাছে খুব মূল্যবান।
হয়তো সেখানে সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে না।
হয়তো রাস্তা এত সুন্দর হবে না।
হয়তো জীবন এত আরামদায়ক হবে না।
হয়তো অনেক কিছুতেই আপস করতে হবে।
তবুও যদি সেখানে আমার দ্বীন পালন সহজ হয়, সন্তান-সন্ততিদের ঈমানের পরিবেশ পাওয়া সহজ হয়—তাহলে আমার অন্তর সেই জায়গার দিকেই বেশি টানে।
অন্যদিকে, কোনো জায়গা যতই লাক্সারি হোক, যতই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হোক, যতই সুযোগ-সুবিধায় ভরা হোক—যদি সেখানে নিজের চোখের হেফাজত, নিজের নফস, নিজের সন্তানদের ঈমান ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা করা প্রতিনিয়ত কঠিন পরীক্ষা হয়ে যায়, তাহলে সেই আরাম আমার কাছে আর আগের মতো আরাম মনে হয় না।
কারণ কিছু বিলাসিতা হয়তো জীবনকে সহজ করে, কিন্তু কিছু পরিবেশ জীবনকে পরীক্ষাও কঠিন করে দিতে পারে প্রতিনিয়ত।
আমি কাউকে ছোট করছি না।
কোনো জাতি, ধর্ম বা দেশের মানুষকে বিচার করাও আমার উদ্দেশ্য নয়।
আমি শুধু নিজের দুর্বলতাটা জানি।
আমি জানি, আমার ঈমান খুব শক্ত নয়।
আমার সন্তানদের ঈমানও আমার হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
আমাদের প্রত্যেকেরই আল্লাহর সাহায্য দরকার।
তাই যেখানে দ্বীন মেনে চলার জন্য আমাকে কম লড়াই করতে হবে, যেখানে ভালো পরিবেশ আমাকে আল্লাহর দিকে নিবে, মনে করিয়ে দেবে, যেখানে সন্তানদের দ্বীনের ওপর বড় করার সুযোগ বেশি—আমি কেন সেই পরিবেশটাকে বেছে নিতে চাইব না!?
আমাদের রব তো বলেছেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো...”
— সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬
এই আয়াতটা পড়লে আমার নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন আস—
আমি আমার পরিবারের জন্য কী করছি!?
শুধু তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার চেষ্টা করছি?
নাকি তাদের আখিরাতের ভবিষ্যতের কথাও ভাবছি?
কারণ আমরা সবাই একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াব।
সেদিন হয়তো আমি বলতে চাই—
“হে আমার রব, আমি সবকিছু পারিনি। আমি অনেক ভুল করেছি। আমার জ্ঞানও অল্প ছিল। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। যতটুকু বুঝেছি, ততটুকু অনুযায়ী আপনার সন্তুষ্টিকে / দ্বীন কে দুনিয়ার ওপরে রাখার চেষ্টা করেছি। আমার সন্তানদেরও আপনার দিকে রাখার চেষ্টা করেছি।”
এই চেষ্টাটুকুই তো চাই।
মূল কথা হলো ❝দুনিয়া আমাদের দরকার—অবশ্যই দরকার।
কিন্তু দুনিয়া যেন আমাদের দ্বীনের মালিক না হয়ে যায়। ❞
আমরা দুনিয়া উপার্জন করব, কিন্তু হালাল পথে।
সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ দেব, কিন্তু শুধু দুনিয়ার জন্য নয়।
ভালো বাড়ি চাইব, ভালো শিক্ষা চাইব, ভালো চিকিৎসা চাইব—কিন্তু সবকিছুর ওপরে চাইব ঈমান।
কারণ শেষ পর্যন্ত তো—
দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জীবনও ক্ষণস্থায়ী তাই নয় কি?।
কিন্তু ঈমান নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারাটাই আসল সফলতা.......