জাতিগত নির্মূলের শিকার গনপতি পরিবার, মাছুয়াপাড়ার রক্তাক্ত রাত, পুলিশের রঙ্গিন ব্যাখ্যা এবং রংপুরে জজ মিয়ার প্রত্যাবর্তন
রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাসাটিতে এখনও রক্তের দাগ শুকায়নি, অথচ পুলিশের গল্প লেখা শেষ। যে চারটি মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে দখিগঞ্জ শ্মশানে, তাঁদের ছাই এখনও উড়ছে বাতাসে, কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে অপরাধের ব্যাখ্যা জমা হয়ে গেছে গোছানো ফাইলের মতো। এই আত্মবিশ্বাস দেখে কার না সন্দেহ হয় যে এখানে সত্য খোঁজার চেয়ে আখ্যান রচনার তাগিদই বেশি ছিল?
পুলিশ কমিশনার যে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠ করলে মনে হয় কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়া হচ্ছে। ইয়াবা সেবন করতে এসেছিল দুই তরুণ, দেখে ফেলায় পরিবারের সবাইকে খুন করল। খুনের পর খেজুর, শসা খেল, সোনা পরীক্ষা করল, বিদ্যুৎ কেটে অন্ধকারে কাজ সারল, জুমার নামাজের কথা মনে রেখে সময়ক্ষেপণ করল। এই বর্ণনার প্রতিটি শব্দ যেন দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য সাজানো। বাস্তব অপরাধ তদন্তে এমন ঝরঝরে গল্প মেলে কদাচিৎ, আর যখন মেলে তখন সেটি হয় খুব সরল সত্য নয়তো সুবিধাজনক মিথ্যা।
ময়নাতদন্তে যে তথ্য এসেছে, তা পুলিশের গল্পের ভিতই ধ্বসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ বলেছিল, মেয়েটির চোয়াল ভেঙে চোখ বেরিয়ে গিয়েছিল রশির টানে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানালেন, চোয়াল ভাঙার কোনো চিহ্ন নেই। মুখমণ্ডলের যে ক্ষত, তা মরদেহ পঁচনের স্বাভাবিক ফল। পুলিশ বলেছিল, আসামিরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। কিন্তু যে পরিবারের সদস্যরা একে একে নিজেদের হত্যা করিয়ে নিয়েছেন চুপচাপ, সেই দৃশ্য কল্পনা করলে বরং মনে হয়, ভুক্তভোগীরা আত্মহত্যা করেছেন খুনিদের সাহায্যে! এতটা আজ্ঞাবহ ভিকটিম অপরাধ জগতে বিরল বৈকি!
প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক, বিদ্যুতের লাইন কাটা ছিল কেন? পুলিশের গল্প অনুযায়ী, সবকিছু হঠাৎ ঘটে গেছে। তাহলে আগে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কোথায়? স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন নিশ্চিত করেছেন, সংযোগটি স্বাভাবিক ত্রুটির মতো কাটা ছিল না, ইচ্ছা করে খোলা হয়েছিল। হঠাৎ খুনের গল্পের সঙ্গে আগে থেকে বিদ্যুৎ কেটে রাখার এই তথ্য মেলে না। তাহলে কি পুলিশের বলা সময়সূচির আগেই কিছু ঘটেছিল? নাকি ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা আগে থেকেই বাসার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার মতো স্থানীয় জ্ঞান রাখত?
শার্টের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। সিদ্ধার্থর বাবা বলেছেন, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় ছেলের গায়ে ছিল ঘিয়া রঙের গেঞ্জি। গ্রেপ্তারের পর ছেলের গায়ে দেখা গেল আড়ংয়ের শার্ট, যে শার্টের হুবহু জোড়া পরেছিলেন ডিবির এক কর্মকর্তা। পুলিশের ব্যাখ্যা, আড়ংয়ের এই শার্ট রংপুরে দুই শো জনের আছে। যে শহরে আড়ংয়ের শোরুমের ক্রেতা সংখ্যাই সীমিত, সেখানে একই সময়ে একই ডিজাইনের শার্ট দুটি ভিন্ন মানুষের গায়ে, যাদের একজন পুলিশ অপরাধী ধরতে গেছে, আরেকজন অপরাধী হিসেবে ধরা পড়েছে, এই কাকতালীয়তা ঔপন্যাসিকেরও সাহসে কুলায় না। আড়ং একই ডিজাইনের পোশাক ব্যাপক সংখ্যায় তৈরি করে না, এটা ফ্যাশন জগতের সাধারণ জ্ঞান। দুই শো জনের কথা বলে পুলিশ আসলে নিজেরাই নিজেদের গল্পের ফুটোটা চওড়া করে দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে, ২০১৬ সালের ঝিনাইদহের ঘটনাগুলো এখানে অনিবার্যভাবে এসেই পড়ে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার আগে ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান, শিয়া মতাদর্শী মানুষদের পরপর হত্যা করা হয়েছিল। তখনও পুলিশ বলেছিল, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সাধারণ অপরাধ। পরে দেখা গেল, সেগুলো ছিল বড় হামলার আগে জঙ্গিদের দক্ষতা যাচাইয়ের ট্রায়াল। রংপুরে এর আগে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি খুন হয়েছিলেন জেএমবির হাতে। সেই রংপুরেই আবার সংখ্যালঘু পরিবারের চারজনকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। পুলিশের দায়সারা গল্প মেনে নিলে ঘুম আসবে না কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষেরই।
গণপতি চক্রবর্তীর কাছে চাঁদা দাবির তথ্যটি পুলিশ আমলে নেয়নি। তার স্বজনরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী কারা চাঁদা চাইছিল, পরে বিষয়টির মীমাংসাও হয়েছিল। কারা চাঁদা চাইত? কী মীমাংসা হয়েছিল? এই সূত্র ধরে তদন্ত করলে হয়তো এমন কিছু বেরিয়ে আসত, যা পুলিশের ইয়াবা গল্পের চেয়ে অনেক বেশি অস্বস্তিকর। পুলিশ সেদিকে যায়নি। বরং গল্প সাজিয়েছে মাদক সেবনের মতো সুবিধাজনক মোটিভ দিয়ে। বাংলাদেশে এখন যে কোনো অপরাধের দায় চাপানো হয় মাদকের ওপর। মাদকসেবী মানেই নির্দয় খুনি, এই ফর্মুলা মেনে চললে তদন্তের দরকারই পড়ে না।
মেয়েদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, শিশুটির শরীরে ধারালো অস্ত্রের ক্ষত, মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা, এই সব তথ্য পুলিশের গল্পে অনুপস্থিত। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক প্রকাশ্যে বলেছেন, মুখমণ্ডলের অবস্থা পঁচনের ফল। কিন্তু লিক হওয়া ছবি দেখে মনে হয়, মরদেহগুলো এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল যেন শনাক্ত করা কঠিন হয়। মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়িতে, ছেলের মরদেহ খাটের নিচে, বাবার মরদেহ ছাদে। এই ছড়িয়ে থাকা মরদেহগুলোর অবস্থান পুলিশের বলা
13
6
4August 28, 2026 1.6K