বাংলাদেশ কি একটি মুক্ত, বহুত্ববাদী সমাজের দিকে যাবে, নাকি ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতার চাপ ধীরে ধীরে জনজীবনের স্বাধীন পরিসর সংকুচিত করবে—এই প্রশ্নের উত্তরও বর্তমান সরকারকেই দিতে হবে।
‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসে কার পায়ের নিচে?
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিও কম বিতর্কিত নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে যদি দাবি করা হয় যে বাংলাদেশ আগের ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাহলে বাস্তব কূটনৈতিক অর্জন দিয়ে সেই দাবির প্রমাণ দিতে হবে।
কারণ কূটনীতিতে বড় বড় ঘোষণা নয়—ফলাফলই শেষ কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা স্বাধীন? ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ঢাকা কতটা নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে? ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশল কী? চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা কতটা?
এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ‘নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছি’ বলা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার বিনিময়ে বাংলাদেশ কি এমন কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দেশকেই দিতে হবে?
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক: কূটনৈতিক সাফল্য না প্রতীকী মর্যাদার লড়াই?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক হবে কি না—এ নিয়ে প্রত্যাশা ও জল্পনা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হওয়া বা না হওয়াই একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। তবে যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিতে প্রস্তুত থাকে, অথচ বিনিময়ে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে—দর-কষাকষির টেবিলে বাংলাদেশ আসলে কতটা শক্তিশালী?
পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের তুলনা টেনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক নয়।
তবে আরও ভয়ংকর একটি সম্ভাবনার কথাও রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে—বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ পূরণে বড় ধরনের ছাড় দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কোনো পক্ষের সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তন করে কিংবা ইসরায়েলকে স্বীকৃতির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সেটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বিজয় হবে, নাকি এক পরাশক্তির অনুকম্পা পাওয়ার বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থের বন্ধক রাখা, সেটিই হবে আসল প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত ভয়টা কোথায়?
সব প্রশ্ন এসে শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় দাঁড়ায়।
শেখ হাসিনাকে সরকার কেন এত ভয় পাবে?
যদি তিনি জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকেন, তাঁকে দেশে আসতে দিন।
যদি তাঁর জনপ্রিয়তা শেষ হয়ে থাকে, তাঁকে রাজনৈতিক মাঠে নামতে দিন।
যদি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি শক্তিশালী হয়, তাঁকে দেশে এনে আইনের মুখোমুখি করুন।
আর যদি সরকার মনে করে জনগণ তাঁকে আর গ্রহণ করবে না, তাহলে তাঁকে ঠেকানোর জন্য এত কূটনৈতিক তৎপরতা, এত রাজনৈতিক উদ্বেগ, এত প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজন কোথায়?
রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখনই, যখন কোনো সরকার জনগণকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাতে চায়।
মানুষকে ভয় দেখিয়ে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করে কিংবা প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
শেষ কথা বলে জনগণ।
আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আসল আতঙ্কটা কোথায়।
এটি কি একজন নেত্রীর প্রত্যাবর্তনের ভয়?
নাকি তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সম্ভাব্য জনস্রোতের ভয়?
সময়ের সঙ্গে সেই উত্তরই সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রকাশিত হবে।
#Bangladesh #SheikhHasina
20
4
3September 1, 2026 2.4K 2