ধরুন, সংসারে হঠাৎ একটা সমস্যা দেখা দিল। খুব বড় কিছু না-ও হতে পারে। হয়তো বাসার কোনো জিনিস নষ্ট হয়েছে, কোনো আর্থিক চাপ এসেছে, কারও সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, কিংবা স্ত্রী কোনো একটি বিষয় নিয়ে বেশ মন খারাপ করে বসে আছেন। এবার স্বামীর মাথার ভেতরে কী চলছে, একটু উঁকি দিয়ে দেখা যাক।
স্বামী হয়তো ভাবছে,
“আচ্ছা, সমস্যা হয়েছে। এখন কী করতে হবে? এই সমাধান করতে হয় টাকা লাগবে, নাহলে সময় লাগবে। নাহলে যে মানুষ বা প্রতিষ্ঠান সমাধান করতে পারে, তাদের নিয়ে আসতে হবে।'
ব্যস! তাঁর মাথার ভেতরে যেন মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট্ট “সমস্যা সমাধান কমিটি” বসে গেছে। সমস্যা এসেছে মানে, সেটার একটা সমাধান থাকতে হবে। সমাধান খুঁজে বের করাই তাঁর দায়িত্ব।
এই ঝামেলার মধ্যে যদি এক মুহুর্তে স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এত সমস্যা হচ্ছে, আমার খুব খারাপ লাগছে।”
স্বামী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আচ্ছা, তাহলে তুমি কাল ওনাকে ফোন করে এটা বলে দাও। তাহলেই তো সব সমস্যা শেষ!”
স্বামী মনে মনে বেশ সন্তুষ্ট। তিনি ভাবছেন, “বাহ! আলহামদুলিল্লাহ, দারুণ এক সমাধান দিয়ে দিলাম।”
কিন্তু পাশে বসে স্ত্রী ভাবছেন, “এইটুকুই? আমি এত কষ্ট করে এত কথা বললাম, আর উনি আমাকে একটা সমাধান দিয়ে আলোচনা শেষ করে দিলেন?”
এবার একটু স্ত্রীর মনের ভেতরে ঢোকা যাক। সে হয়তো ভাবছে,
“আজকে আমার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু শুধু ওই ঘটনাটার জন্যই কি এত খারাপ লাগা? সকালে ও আমার দিকে ঠিকমতো তাকাল না কেন? কালও তো খুব একটা কথা বলেনি। ও কি আমার ওপর বিরক্ত? নাকি আমি কিছু ভুল করেছি? আমাকে কি আগের মতো সুন্দর লাগে না? আমি কি আসলেই মোটা হয়ে গেছি? আচ্ছা, গত সপ্তাহে ও যে কথাটা বলেছিল, সেটার সঙ্গে কি আজকের ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে? ও কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসে? আমি এত মন খারাপ করে আছি, ও কি কিছুই বুঝতেই পারছে না?”
একটি ঘটনা থেকে তার মন কখনো কখনো ৪ ধরণের অনুভূতি, ৩ টি পুরাতন স্মৃতি, ১ টা আশঙ্কা এবং ২ বছর আগের কোনো কথোপকথন পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারে! বিষয়টি সব নারীর ক্ষেত্রে একই রকম নয়, অবশ্যই। কিন্তু অনেক নারীর মন সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিষয়, কথার টোন, মুখের অভিব্যক্তি, মানসিক নিরাপত্তাবোধ এবং ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।
আর এখানেই সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি ঘটে। স্ত্রী হয়তো তখন সমস্যার সমাধানটাই প্রথমে চাইছেন না। তিনি চাইছেন সমস্যাটা নিয়ে একটু কথা বলতে। সে চাচ্ছে, জীবনসঙ্গী তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক। মাঝখানে ফোনটা সরিয়ে রাখুক। একটু কাছে এসে বসুক। হাতটা ধরুক। হয়তো মাথায় হাত বুলিয়ে বলুক, “তোমার খুব খারাপ লেগেছে, তাই না? আচ্ছা আমাকে খুলে বলো … ”
ব্যস! সমস্যা তখনও আছে, কিন্তু অর্ধেক সমাধান হয়ে গেছে।
অথচ স্বামী তখন অবাক হয়ে ভাবতে পারেন, “সমস্যাটা তো এখনো সমাধানই হয়নি! কথা বলেই এত খুশি হলো কীভাবে?”
কারণ বিপরীত লিঙ্গের দুই জনের কাছে “সমস্যার সমাধান” শব্দটির অর্থ কখনো কখনো এক নয়।
অনেক পুরুষের কাছে ভালোবাসার প্রকাশ হলো, “তোমার সমস্যা আমাকে দাও, আমি কিছু একটা করার চেষ্টা করি।” আর অনেক নারীর কাছে ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে, “আমার সমস্যাটা ঠিক করার আগে একটু আমার কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করো”
এখান থেকেই দাম্পত্যের বহু অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝির জন্ম হয়।
স্ত্রী ভাবেন, “উনি আমার অনুভূতিই বোঝেন না।”
স্বামী ভাবেন, “আমি তো সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার জন্য এত চেষ্টা করছি! তারপরও আমি খারাপ স্বামী হয়ে গেলাম কীভাবে?”
আসলে দুজনের কেউই হয়তো খারাপ নন। দুজনেই ভালোবাসছেন। শুধু ভালোবাসার প্রকাশের পদ্ধতিটা আলাদা।
তাই একজন স্ত্রী যদি বুঝতে পারেন, “আমার স্বামী হয়তো আমার সঙ্গে এক ঘণ্টা বসে একই বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলার মানসিক অবস্থায় সব সময় থাকবেন না। সবসময় আমার এত প্রত্যাশা করে থাকার দরকার নাই। সমাধান করে দিচ্ছেন, এতেই আমি খুশি আলহামদুলিল্লাহ।
তিনি আমার সমস্যাটা সমাধান করার জন্য ফোন করছেন, টাকা জোগাড় করছেন, তথ্য খুঁজছেন, কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকছেন – এই তো তার ভালোবাসার ভাষা,” তাহলে তার অনেক অভিমান হালকা হয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে স্ত্রী নিজের প্রয়োজনটাও স্বামীকে পরিষ্কার করে বলতে পারেন, “আমি জানি তুমি আমার সমস্যাটা সমাধান করতে চাও, আর আমি সেটা খুব appreciate করি। কিন্তু এখন আমাকে কোনো সমাধান দিতে হবে না। তুমি শুধু ১০ মিনিট আমার পাশে বসে থাকো, আমার কথাটা শুনো।”
স্বামী ভদ্রলোক হয়তো এতদিন জানতেনই না যে এই অপশনটাও আছে!
অন্যদিকে একজন স্বামীও যদি বুঝতে পারেন, স্ত্রী কোনো বিষয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে কথা বলছেন মানেই তিনি “নাটক করছেন” না। যে বিষয়টি তাঁর কাছে ৫ মিনিটের সমাধানের বিষয়, সেটি স্ত্রীর মনে হয়তো নিরাপত্তা, গ্রহণযোগ্যতা অথবা অন্যান্য নানা বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।