Muhammad Sajal
হাসিনা সরকারের আমলের শেষ জুম্মা ছিল ২রা অগাস্ট। আগেরদিন সেনাবাহিনীর অনেক ক্যান্টনমেন্ট মসজিদে জেসিও-এনসিওরা মিলে তাদের সন্তান ও সৈনিকদের চাপে সিদ্ধান্ত নেয়, জুম্মার মুনাজাতে জালিমের ধ্বংসের জন্য ইমাম সাহেবকে দিয়ে দোয়া করানো হবে।
বিষয়টা আগেভাগে জেনে যায় সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন অফিসাররা।
তারা আদেশ দেয়, ক্যান্টনমেন্ট মসজিদে জালিমের ধ্বংসের জন্য কোন দোয়া করা যাবে না।
বিএমএ-৭০ লং কোর্স থেকে বিএমএ-৭৯ লং কোর্সের বিপুল সংখ্যক অফিসার এসময় জেসিও-এনসিওদের সাথে সহযোগিতা করে। ফলে অনেক ক্যান্টনমেন্ট মসজিদে জুম্মার মুনাজাতে ২রা অগাস্ট জালিমের ধ্বংসের জন্য দোয়া হয়, আবার অনেক মসজিদেই সেটা হয় না।
১৮ই জুলাই-২২শে জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া মারাত্মক গনহ/ত্যার সব ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভে ফুসে ওঠে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশ। বিভিন্ন ওয়াটস্যাপ গ্রুপে প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা শুরু হয়। সিনিয়র অফিসার-জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন চরমে ওঠে ২৭শে জুলাইয়ের পর থেকে। তরুণ অফিসাররা বুঝতে পারে, তাদের পথ ও ভবিষ্যত সিনিয়র অফিসারদের থেকে চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই বাড়তে থাকে অসন্তোষ।
৩০শে জুলাই থেকে গ্যারিসন কমান্ডাররা যা বলছিলেন, ফিল্ডে তা ঘটছিল না। কোন কোম্পানি ফিল্ডে কি করবে তা নিয়ে কোন ভরসা পাচ্ছিলো না কর্নেল-ব্রিগেডিয়াররা। এর আগেও ১৮-২১শে জুলাই বারবার ফিল্ড লেভেল অফিসাররা কমান্ডারের নির্দেশকে বিভিন্নভাবে এড়িয়ে গেছে দায়িত্ব পালনের সময়। আবার, একশ্রেনীর আওয়ামী অফিসাররা বুঝতে পারছিল, হাসিনা সরকারের পতন হলে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার। এরা বিভিন্ন স্পটে ১৮-২১শে জুলাই হিংস্রভাবে অপারেশন পরিচালনা করে।
এসময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ একজন ব্রিগেডিয়ার খুজছিলো, যে একটা গ্যারিসনকে কমান্ড করে এবং যার অবস্থান ঢাকার কাছাকাছি এবং যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবুজ সংকেত পাওয়ামাত্র নিজের বাহিনী নিয়ে ঢাকার দিকে মুভ করবে। সিনিয়র রাজনীতিবিদরা ওয়াকিফহাল ছিলেন, ২০১৩ সালে তুমুল আন্দোলনের পরেও সেনাবাহিনী সরকারের পক্ষে থাকায় বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয় নি। তাই সেনাবাহিনীকে অন্তত নিষ্ক্রিয় রাখা বা হাসিনার বিরুদ্ধে দাড় করাতে না পারলে যে ভয়াবহ রক্তপাতের আশঙ্কা সৃষ্টি হত, সেটা এড়ানোর আর কোন উপায় পাওয়া যাচ্ছিলো না। ওদিকে এই আশঙ্কাও ছিল যে বাহিনী থেকে বিদ্রোহ হলে একটা অংশ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াবে, যার ফল হবে গৃহযুদ্ধ।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের তরুণ অংশটি, বিশেষ করে ছাত্রসংগঠনগুলো ততদিনে মানসিকভাবে তৈরি হয়ে যায় সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য। কিন্তু অস্ত্র কোত্থেকে আসবে, প্রশিক্ষন কিভাবে আসবে, কেউ জানতো না। সেনাবাহিনী কি ভাবছে, তা ছিল বেশিরভাগের কাছেই অজানা। সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের মতামত যে ততদিনে গৌন হয়ে পড়েছে, তা তখনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানতো না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন কোন ব্রিগেডিয়ার পাওয়া যায় নি, যে হাসিনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে অন্তত রক্তপাতটা থামাতে পারে।
কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের অনেক বাসিন্দাই নিজেদের ভাই-বন্ধু-আপনজনদের রক্তপাতকে স্বাভাবিকভাবে নেয় নি। ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে জবরদস্তি করায় একাধিক ব্রিগেডে ১ তারিখ রাতে জুনিয়র অফিসাররা ব্রিগেড কমান্ডিং অফিসারকে অবরুদ্ধ করে। ঢাকার খুব কাছেরই একটি ক্যান্টনমেন্টে হাসিনার অনুগত এক ব্রিগেডিয়ারকে মেজররা চ্যাংদোলা করে টেবিলের ওপর এনে বসালে সে ভয়ে কেদে ফেলে এবং আগামীতে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকবে এই ওয়াদা করে।(এই টেবিলে বসানোটা গুজবও হতে পারে)
৩১শে জুলাই, ১লা অগাস্ট, ২রা অগাস্ট বিজিবিতে থাকা জুনিয়র অফিসারদের একাংশ আন্দোলনকারীদের জানিয়ে দেয়, বর্ডার দিয়ে দেদারসে ভারতীয় অস্ত্র ঢুকছে। এই অস্ত্র আনা হচ্ছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের জন্য, যার বেশিরভাগ ১-২ তারিখে ঢাকা ও তার আশেপাশের শহর, অন্যান্য বড় শহরগুলোতে মওজুদ করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো আওয়ামী লীগের দুই স/ন্ত্রাসী শাখা।
২ তারিখ নাগাদ ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ জানতে পারে, যদি সশস্ত্র সংগ্রাম হয়, পুলিশের কিছু অফিসার এবং কিছু সেনা অফিসার সাধারন মানুষের কাতারে এসে লড়াইয়ে অংশগ্রহন করতে পারে। কিন্তু তাদের সংখ্যা কত সেটা নিশ্চিত ছিল না।
জেনারেল ওয়াকারের ওপর এসময় হাসিনা আস্থা হারিয়ে ফেলে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব ওয়াকারকে গ্রেফতার করে তার জায়গায় নিজে সেনাপ্রধান হিসেবে বসার পরিকল্পনা এটে ফেলে, কিন্তু সেনাপ্রধানের বন্ধু বিমান বাহিনী প্রধানের ইন্টেলিজেন্স কাভারে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।(নট কনফার্মড))
ভারত দ্রুত পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রন হারাতে থাকে। গায়ের জোরে হাসিনাকে বাংলাদেশে রাখতে গেলে গৃহযুদ্ধ হয়ে যাবে, যা শুধু সেভেন সিস্টার্স না, পশ্চিমবঙ্গেও ছড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করতে থাকে ভারত। ফলে তারা প্ল্যান বি'তে শিফট করা শুরু করে, যা সম্পর্কে শেখ হাসিনার বা বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারোই কোন ধারনাই ছিল না।