#একটুখানি_তাদাব্বুর
"হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলেছে?"
— সূরা আল-ইনফিতার: ৬।
কুরআনের সবচেয়ে নাড়া দেওয়া প্রশ্নগুলোর একটি এটি। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ এখানে বলেননি— "তুমি কেন অবাধ্য হলে?" কিংবা "কেন গুনাহ করলে?" বরং তিনি এমন একটি প্রশ্ন করেছেন, যা মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে—
"কিসে তোমাকে ধোঁকায় ফেলেছে?"
এই প্রশ্নের ভেতরে যেন এক অসীম মমতা লুকিয়ে আছে। যেন একজন দয়ালু রব তাঁর পথভ্রষ্ট বান্দাকে জিজ্ঞেস করছেন, "কী এমন হলো যে তুমি আমার থেকে দূরে সরে গেলে?"
তাদাব্বুর :
মানুষ সাধারণত আল্লাহকে অস্বীকার করে না; বরং ধীরে ধীরে তাঁর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায়।
✅একটি নামাজ বাদ পড়ে। তারপর আরেকটি।
✅একটি গুনাহকে ছোট মনে হয়। তারপর সেটিই অভ্যাসে পরিণত হয়।
✅একদিন কুরআন না পড়লেও কিছু হয় না। এরপর মাস কেটে যায়।
এভাবেই শয়তান মানুষকে এক লাফে নয়, ধাপে ধাপে ধোঁকায় ফেলে।
তবে সবচেয়ে বড় ধোঁকা কী?
সবচেয়ে বড় ধোঁকা হলো—
"আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরে তাওবা করে নেব।"
হ্যাঁ, আল্লাহ অবশ্যই পরম ক্ষমাশীল। কিন্তু কে নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আমরা তাওবার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকব?
আরেকটি ধোঁকা হলো—
"আমি তো খারাপ মানুষ নই।"
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি কি আল্লাহর হক আদায় করছি? ভালো মানুষ হওয়া যথেষ্ট নয়; আল্লাহর অনুগত বান্দা হওয়াই প্রকৃত সফলতা।
এই আয়াতের গভীর সৌন্দর্য :
আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন "রব্বিকাল কারীম"— "তোমার মহান, দয়ালু রব" হিসেবে।
তিনি চাইলে বলতে পারতেন— "প্রতাপশালী রব" বা "শাস্তিদাতা রব"। কিন্তু তিনি বলেছেন— কারীম।
কেন?
কারণ অনেক সময় মানুষ আল্লাহর দয়াকেই ভুলভাবে ব্যবহার করে। আল্লাহ বারবার সুযোগ দেন, গুনাহ ঢেকে রাখেন, রিযিক দেন, সুস্থতা দেন— আর মানুষ ভাবে, "আমার কিছুই হবে না।"
অথচ আল্লাহর দয়া গুনাহে সাহসী হওয়ার জন্য নয়; বরং তাঁর দিকে ফিরে আসার জন্য।
নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করুন :
✅কতদিন হলো আমি কুরআনের সামনে বসিনি?
✅আমার শেষ অশ্রুসিক্ত সিজদা কবে ছিল?
✅দুনিয়ার ব্যস্ততা কি আমাকে আমার রব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে?
✅আমি কি আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করছি, কিন্তু তাঁর আনুগত্যে অবহেলা করছি?
এই আয়াত অন্য কাউকে প্রশ্ন করছে না বরং আমাকেই করছে!
"হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলেছে?"
হয়তো ধোঁকাটা আমার সম্পদ। হয়তো আমার ক্যারিয়ার। হয়তো মোবাইলের পর্দা। হয়তো অহংকার। হয়তো দীর্ঘ আশা। হয়তো এই ধারণা— "এখনো অনেক সময় আছে।"
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি সূর্যাস্ত আমাদের জীবনের একটি দিন কমিয়ে দেয়। মৃত্যু আমাদের বয়স দেখে আসে না; আসে আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে।
আজ যদি এই আয়াত আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, তবে সেটিই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কারণ হৃদয় যতক্ষণ জীবিত, ততক্ষণ ফিরে আসার দরজা খোলা।
তাই আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা উচিত।
"হে আল্লাহ! আমাদেরকে দুনিয়ার মিথ্যা ধোঁকা থেকে রক্ষা করুন। আপনার অসীম দয়াকে যেন কখনো গুনাহে লিপ্ত থাকার অজুহাত না বানাই। আমাদের অন্তরকে আপনার দিকে ফিরিয়ে দিন, মৃত্যুর পূর্বেই সত্যিকার তাওবার তাওফীক দান করুন এবং আপনার আনুগত্যের ওপর অবিচল রাখুন।"
আমীন ইয়া রব্বাল আলা'মিন।