সোশ্যাল মিডিয়া বা অনলাইন জগত একটা ফুল অফ ডিস্ট্রাকশন। এই জগতে ফোকাস ধরে রাখা সো টাফ।
ইমোশন ডাইভার্স হয় প্রতিনিয়ত। এই যে ধরুন আপনি একটা ট্র্যাজেডির পোস্ট দেখলেন, কষ্ট পেলেন, কিন্তু ২ সেকেন্ড পরে স্ক্রল করতেই মারাত্মক হাসির একটা পোস্ট — আপনি হাসা শুরু করলেন।
কী প্যাথেটিক ইমোশনাল ডাইভার্সিটি।
আমি এই আচরণটা পৈশাচিক মনে করি।
আমারও হয় না, এমন না। আমারও হয়। ফানি কিছু দেখার পর কুরআন তিলাওয়াত আসলে একটু ইতস্তত বোধ হয়।
যাইহোক, যেটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। তারবিয়া অনলাইন মাদরাসার ইভেন্টে কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। মূল কথা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় দাওয়াহ নিয়ে। এই যুগে দাওয়াহর অন্যতম বড় ময়দান এটা। তাই এখানে থাকতে হবে — কিন্তু বুঝে, সতর্ক হয়ে। সেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরতে চাচ্ছি।
এক — এটা সুযোগ, আবার ফাঁদও।
এখানে কনটেন্ট, লেখালেখি, অ্যাক্টিভিজম দিয়ে বিশাল দাওয়াহর সুযোগ আছে, সত্য। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখবেন — যে জলাশয়ে মাছ ধরতে নামছেন, সেখানে নিজেই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে। দাওয়াহ দিতে এসে নিজেই যে ডিস্ট্র্যাকশনের শিকার হবেন না — এর কোনো গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। এজন্য উদ্দেশ্য সবসময় স্মরণ রাখা।
দুই — প্রত্যেকটা Like দৃশ্যমান
আমরা প্র্যাকটিসিংরা সোশ্যাল মিডিয়া চালাতেই জানি না।
কথাটা কড়া, কিন্তু সত্য। উড়াধুড়া লাইক, কমেন্ট, শেয়ার দেওয়া মানে সোশ্যাল মিডিয়া না। এখানে আপনার প্রতিটা পদক্ষেপ ম্যাটার করে।
এমন অনেককে দেখা যায় — দাড়ি-টুপি পড়া লোক, হিন্দি সিনেমার পোস্টে লাইক দিয়েছে, অনেক মহিলাদের পোস্টে লাইক। মানে আপনার দেওয়া লাইকটা যে কাউন্ট হচ্ছে, এবং সেটা যে আপনার লিস্টের লোক দেখছে, পাবলিক দেখছে — একজন দ্বীনদার লোক কিসে লাইক দিচ্ছে।
আপনার লাইকটাও আপনার পরিচয়। এটা মাথায় থাকে না আমাদের।
তিন — Comment- এ আমরা সবচেয়ে বেপরোয়া।
ঘটনা যাচাই না করেই ট্যাগিং, গালাগালি, "জাহান্নামি" ঘোষণা করে দেওয়া — এসব যেন আমাদের স্বভাব হয়ে গেছে।
অথচ ভাবুন, যে মানুষটা দ্বীন থেকে দূরে, তার পোস্টে একটা কড়া গালি না দিয়ে যদি একটা সুন্দর, নরম কথা লিখতাম — হয়তো সেটাই তার হেদায়েতের কারণ হতো। কিন্তু আমরা গালি দিয়ে তাকে দ্বীন থেকে আরও দূরে ঠেলে দিই। আমাদের একটা কমেন্ট কাউকে কাছে টানতে পারত, আমরা সেটা দিয়ে দূরে সরাই।
চার — Share আপনার ব্যক্তিত্বকে রিপ্রেজেন্ট করে
আমরা শেয়ারের ক্ষেত্রেও বেখেয়াল। সোশ্যাল মিডিয়ায় কী শেয়ার দিচ্ছি, এটাও আমাদের ব্যক্তিত্বকে ভিজিবল করে। এখন যেহেতু এই যুগ চলছে, সো এগুলো করতে হবে — কিন্তু বুঝে করতে হবে।
পাঁচ — সব ইস্যুতে নাক গলানো
এটা যেন আমাদের কমন কাজ। ভিশনারি কোনো কাজ নেই। যখন যেই ইস্যু, সেই ইস্যু নিয়ে আমরা একেকটা মাতবর কুতুব। আমি নিজেও হয়ে যাই। ট্রেন্ডে, বাতাসে।
সব ইস্যুতে নাক গলানো যাবে না। কোন ইস্যু উম্মাহর খেদমতে আর কোন ইস্যু দাওয়াহ ময়দান নষ্ট করে — সেটা মাথায় নিয়ে কথা বলতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব, যখন আপনি ভিশন ঠিক করবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার উদ্দেশ্য ঠিক করবেন। তাছাড়া সম্ভব না।
ছয় — এবং সবচেয়ে জরুরি — শত্রু চিনুন।
একটা উদাহরণ দিই, খেয়াল করে শুনুন।
ধরুন একটা পেইজ, নাম "৭৮ টিভি"। এই পেইজ থেকে দিনের পর দিন ইসলামবিদ্বেষী পোস্ট আসে। আমাদের "নামানুষ" প্রমাণ করার ন্যারেটিভ তৈরি হয়। মুসলিমদের ছোট করা হয়, বিকৃত করা হয়।
তারপর হঠাৎ একদিন সেই পেইজ থেকেই একটা "ইসলামিক" পোস্ট আসে — "১৪০০ বছর আগে ইসলাম পৃথিবীতে আলো এনেছিল।"
ব্যস। আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি। ধুমধাম লাইক, কমেন্টে "আলহামদুলিল্লাহ", শেয়ারের ওপর শেয়ার। পোস্ট ভাইরাল।
এই আচরণটার একটা নাম আছে — controlled opposition, নিয়ন্ত্রিত বিরোধিতা। আগে আপনার আস্থা কেড়ে নেওয়া হয়, তারপর একটা 'ভালো' পোস্ট দিয়ে সেই আস্থা কিনে নেওয়া হয়।
.
তাহলে ভাবুন আমাদের অবস্থা। এমন দেখলে কষ্ট লাগে — যেই পেইজ বা চ্যানেলটা আপনাকে-আমাকে 'নামানুষ' বানানোর ন্যারেটিভ চালিয়ে মারতে চায়, তাদের পেইজই কিছুদিন পর অন্য ইস্যুতে আমরা খুউব ট্রাস্ট নিয়ে শেয়ার দেই।
সাচ আ পিটি অ্যাক্ট অফ ডাম্বনেস।
আপনার লাইক, আপনার কমেন্ট, আপনার শেয়ার — সবকিছু ম্যাটার করে। এই জগতে নিরপেক্ষ কিছু নেই।
সব কিছুরই বাটারফ্ল্যাই ইফেক্ট আছে।
আল্লাহ আমাদের বুঝ দিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে চলার তাওফিক দিন। আমীন।
— Abu MuHammad Rafiuzzaman
@MuslimInspirationOfficial