যায়িদ বিন হারিসা রাযি.
সাহাবী যায়িদ বিন হারিসা রাযি. ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আযাদকৃত দাস ও পালিত পুত্র। ইমামদের কারো কারো মতে, পুরুষদের মাঝে সর্বপ্রথম যায়িদ রা. ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি একমাত্র সাহাবী যার নাম সরাসরি পবিত্র কুরআনে (সূরা আল-আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বাল্যকাল থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সোহবতে বড় হয়েছেন এবং রাসূলের ঘরের মানুষ হিসাবে থেকেছেন।
বাল্যকালে এক সফরে ডাকাতদের দ্বারা আক্রান্ত ও লুণ্ঠিত হয়ে তিনি বন্দী হন। পরবর্তীতে মক্কার বাজারে ওনাকে বিক্রি করা হলে উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা. তাঁকে কিনে নেন এবং নবীজির ﷺ সাথে বিয়ের পর ওনাকে উপহার দেন।
যায়িদ রা. এর বাবা ও চাচা অনেক খোঁজাখুজি করে মক্কায় এসে ওনাকে পেয়ে যান। তখন তারা কিশোর যায়িদকে তাদের সাথে বাড়িতে ফেরত নিতে চাইলে আল্লাহর রাসূলের ﷺ সান্নিধ্য রেখে বাবা-মা’র কাছে যেতে অস্বীকার করেন। তখন নবীজি ﷺ খুশি হয়ে যায়িদকে নিজের (পালিত) পুত্র হিসাবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে ইসলামে পালক পুত্র প্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ ওনাকে 'যায়িদ বিন মুহাম্মদ' (মুহাম্মদের পুত্র যায়িদ) বলে ডাকত।
নবুয়তের একেবারে প্রথম দিকেই তিনি ঈমান আনেন এবং শাহাদাতের আগ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের ﷺ সান্নিধ্যে ছিলেন।
রাসূলুল্লাহর ﷺ বিখ্যাত সেই তায়েফ সফরে যায়িদ রাযি. ছিলেন ওনার একমাত্র সফর-সঙ্গী। তায়েফের দুষ্ট লোকেরা যখন নবীজি ﷺ কে পাথর ছুড়ে রক্তাপ্লুত করছিল, তখন যায়িদ রাযি. নিজের শরীর দিয়ে নবীজিকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। পাথরের আঘাতে ওনার নিজের মাথা ও শরীরও ফেটে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।
ইসলামের বিখ্যাত তরুণ বীর সেনাপতি উসামা বিন যায়িদ রা. ছিলেন যায়িদ বিন হারিসা রাযি. এর সুযোগ্য পুত্র।
মদীনায় হিজরতের পর থেকে সকল জিহাদে যায়িদ রাযি. শামিল থাকতেন। তিনি বীরত্বের জন্য প্রশংসিত ছিলেন। একাধিক সারিয়্যাতে তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন।
যায়িদ রা. ছিলেন অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, বদরের দিন তিনি ও আলী রাযি. স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে একই উটে পালাক্রমে সফরের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
নবীজির ﷺ ফুফাতো বোনের সাথে যায়িদ রা. এর তালাকের প্রেক্ষাপটে সূরা আল-আহজাবের একটি আয়াত নাজিল হয়েছে যেখানে ওনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনিই একমাত্র সাহাবী যার নাম কুরআনে এসেছে।
বিখ্যাত মূতার যুদ্ধে রোমান বাইজেন্টাইনদের সাথে জিহাদে যায়িদ রা. সেনাপতি হিসাবে যুদ্ধরত অবস্থায় শাহাদাতের নিয়ামত লাভ করেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, শাহাদাতের সময় তিনি মাত্র ৫০ বছরের একজন মজবুত কমান্ডার ছিলেন। ওনার শাহাদাতের সংবাদ শোনার পর পিতাতুল্য রাসূলুল্লাহ ﷺ কান্না করতে থাকেন এবং বলতে থাকেন — সে আমার প্রিয়, সে আমার আপন!
আহ! কি সৌভাগ্যবান জীবন ছিল যায়িদ রা. এর গোলাম থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পুত্রতুল্য হয়ে গিয়েছিলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ ওনার জন্য কান্না করেছিলেন।
পরবর্তীতে যায়িদ রা. এর ছেলেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নাতির চোখে দেখতেন এবং দাদার মতো স্নেহ করতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যায়িদকে রা. এতো বেশি স্নেহ করতেন যে, তিনি বলতেন — যায়িদ! আমি তোমার মাওলা। তুমি আমার থেকে, তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সম্বোধনের কারণে যায়িদকে রা. সবাই সম্মান করে – প্রিয় যায়িদ বলে অভিহিত করতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যায়িদকে রা. এতো স্নেহ ও ভরসা করতেন যে, ওনাকে বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব দিতেন এবং নিজের তরবারি যায়িদকে রা. দিতেন। এই সৌভাগ্য শুধুমাত্র যায়িদ ও আলী রাযি. লাভ করেছিলেন।
এছাড়াও দুইবার ওনাকে মদীনার শাসনভার অর্পণ করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিহাদে যাবার সময় ওনাকে দুইবার মদীনার শাসনভার দিয়ে গিয়েছিলেন।
আল্লাহ হযরত যায়িদ এর উপর রহম করুন।
■ রাসূল মুহাম্মাদের ﷺ সেনাবাহিনী ও কমান্ডার — পর্ব ৫
/: @abidmohammad2
8September 3, 2026 317 1