সাদি মুহম্মদ একজন মুসলিম ছিলেন। আমরা দেখলাম তাঁর মৃত্যুতে আগুনের পরশমণি গান গাওয়ার হলো ।
এরপর রবীন্দ্র কালচার ঘিরে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সভাপতি সানজিদা খাতুনের মৃত্যুর পর ঘন্টা খানেক ধরে তার লাশকে ঘিরে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া হলো। শত শত ভক্তরা সানজিদা খাতুনের লাশ সামনে নিয়ে বিদায় জানালেন। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়। ষাটের দশকে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কলিম শরাফী ছায়ানট গড়ে তোলেন যেখানে সুফিয়া কামালকে সভাপতি এবং ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করেন। প্রথমদিকে গান শেখানোর পশাপাশি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তবে ১৯৬৪ সালে, বাংলা ১৩৭১ পহেলা বৈশাখ রমনায় নববর্ষ পালন করে ছায়ানট । এরপর ধীরে ধীরে হিন্দু কালচারের প্রতিটি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে উদযাপন করা হয় । যে কোন উদযাপনে রবীন্দ্র সংগীত উপজীব্য করে কালচারাল কার্যক্রম মূলত কালচারাল প্রভুত্বের শামিল। তাই ছায়ানট অনুরাগীরা রবীন্দ্র সংগীত কেন্দ্রিক যে কালচারের হর্তা কর্তা তা মূলত রাবিন্দ্রিক কাল্ট।
মোস্তফা মনোয়ার ছিলেন গোলাম মোস্তফার ছেলে। গোলাম মোস্তফা ছিলেন মুসলিম জাগরণের অন্যতম কবি। রাসূল স. এর উপর তাঁর লেখা বিশ্বনবী ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় জীবনী। গোলাম মোস্তফার "ইসলাম ও কমিউনিজম", "আমার চিন্তাধারা" ছিল তাঁর গভীর চিন্তার ফসল। চল্লিশের দশকে যারাই ইসলাম ও মুসলিম সাংস্কৃতির পক্ষে ছিলেন তাদের সন্তানরা একাত্তর পরবর্তী সেকুলার ও বামপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের সাথে যুক্ত হন। যেমন আবুল হাসিম, আবুল মনসুর আহমদ, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যাদের সন্তানরা বাবার চিন্তার বিপরীতে রাজনৈতিক বয়ান উৎপাদন করেন। মোস্তফা মনোয়ারের মৃত্যু পরবর্তী তার লাশ ঘিরে দিজেন্দ্রলাল রায়ের গান গাওয়া হলো। মোস্তফা মনোয়ার একজন গুণী শিল্পী ছিলেন। গত মাসে এক পোডকাস্টে কুরআন নিয়ে কথা বলতে দেখেছিলাম। তিনি হয়তো শেষ জীবনে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
উনিশ শতকে রাজা রামমোহনের(১৭৭২-১৮৩৩) হাত ধরে হিন্দু ধর্মের বাইরে গিয়ে নতুন ধর্ম চিন্তার কথা ভাবা হয় । এই উনিশ শতকেই বঙ্কিমের(১৮৩৮-১৮৯৪) হাতে নতুন ধর্মের রূপ তৈরি হয় । যা পরবর্তীতে দেশ ভক্তিতে রূপ নেয় । ধর্ম অর্থাৎ দেশ সেবা এবং ঈশ্বর অর্থাৎ দেশ এই মন্ত্রে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচার ও প্রসার করল । এরমধ্যেই রবীন্দ্রনাথের(১৮৬১-১৯৪১) জন্ম । রবীন্দ্রনাথ নাথ ,স্বামী ও প্রভু সম্বোধনে গান লিখেছেন । তবে তার গানে ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে । কখনো আকুতি কখনো বাসনা কখনো করুনা প্রকাশ পেয়েছে । আরো গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এসবের পেছনে বেদ ও উপনিষদের প্রভাব রয়েছে প্রকট ।
মোটের উপর বলতে গেলে বাংলাদেশে যে রবীন্দ্র কালচার তা মূলত কাল্ট হিসবে প্রচার ও প্রসার হচ্ছে । যা বাংলাদেশের মুসলমানদের মনস্তত্ব ও আচারে ধীরে ধীরে গেথে যাচ্ছে । এক সময় এদেশের মুসলিমদের ধর্মচর্চার সাথে রাবিন্দ্রিক কাল্ট অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছি।
ব্যক্তি ,সমাজ ও রাষ্ট্রে যা নিছক সংস্কৃতি ও সভ্যতা সমপর্যায়ের বললে ভুল হবে না। ধরেন আপনি রাবিন্দ্রিক কালচার বয়কট করলেন তার মানে এই নয় যে এই কালচার বিলুপ্ত হয়ে যাবে । যারা বিরোধীতা করছে বরং তারাই রাষ্ট্রের মূল ধারায় প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে । আর দিন দিন এটা আরো প্রবল হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে । চারুকলা ,ছায়ানট ,সংগীত ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা, একাডেমি এসব মূলত রাবিন্দ্রিক কালচারের কেন্দ্র পর্যায়ের। তবে এই কালচার সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে যে সমন্বয় ঘটিয়েছে তাতে স্রেফ রাবিন্দ্রিক কালচার আর কালচার পর্যায়ে নাই তা এখন সভ্যতা পর্যায়ভুক্ত । এখানে সেক্যুলারিজম খুব গুরুত্বের সাথে কাজ করছে । এখানে আগুনের পরশমণি অথবা ধনধান্যে পুষ্পভরা গান গেয়ে যে কালচার তার উদ্দেশ্য অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, মানব ধর্ম অথবা সেক্যুলার ধর্মের ধর্ম গুরু এটা কম প্রাসঙ্গিক । এখানে তার চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হচ্ছে রবীন্দ্র সভ্যতা যারা হুমকি মনে করছে তাদের সভ্যতা নির্মাণের খোরাক কি !
এই রাবিন্দ্রিক কালচার মোকাবিলায় আপনার রসদ কি ? অথবা আপনি কি ধরনের সংস্কৃতি ও কালচার দিয়া রাবিন্দ্রিক কাল্ট মোকাবিলা করবেন ? রাবিন্দ্রিক কাল্ট বিরোধীতার চেয়ে নিজেদের চিন্তা ও দর্শনের পুনর্গঠন জরুরী । আপনি কারো পিছে পড়ে থাকলে কখনোই সামনে পৌঁছাতে পারবেন না । তাই নিজস্ব চিন্তার যথাযথ মূল্যায়ন করে সংস্কৃতি ও সভ্যতার পাটাতন তৈরি ছাড়া এদেশের মুসলিমদের রাবিন্দ্রিক কাল্ট থেকে মুক্তি মিলবে না । জুলাই যে বিপ্লবের স্পিরিট তৈরি করে গেছে সেই স্পিরিট ধারণ করে একটা কালচার গড়ে তোলাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সকল শহীদ ও যোদ্ধাদের লাল সালাম। জুলাই মোবারক।
4July 1, 2026 290