কে আছে, আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নেবে?
.
৬৩৬ সালের ইয়ারমুক উপত্যকা। মাত্র ৪০হাজার মুসলিম বাহিনীর সামনে রোমান সাম্রাজ্যের ২লাখের বিশাল বাহিনী। যুদ্ধ ততক্ষণে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ধুলোয় ঢেকে গেছে আকাশ। তলোয়ারের ঝনঝনানি, আহতদের আর্তনাদ আর তাকবীরের ধ্বনিতে কেঁপে উঠছে পুরো উপত্যকা।
.
মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। শত্রুর অবিরাম আক্রমণে কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গেছে মুসলিম বাহিনী। ঠিক তখনই এক যোদ্ধা তার ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। হাতে তলোয়ার। চোখে অদম্য দৃঢ়তা।
.
তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন—
"কে আছে, আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নেবে?"
এই ঘোষণা কোনো আবেগতাড়িত স্লোগান ছিল না। এটি ছিল বাইআতুল মাওত—মৃত্যু পর্যন্ত অবিচল থেকে যুদ্ধ করার অঙ্গীকার। যারা তার ডাকে সাড়া দেবেন, তাদের অধিকাংশই হয়তো আর জীবিত ফিরে আসবেন না—এ কথা সবাই জানতেন। কিন্তু তবুও একে একে এগিয়ে এলেন সাহসী মুমিনরা।
.
.
কে ছিলেন সেই মহান ঘোষক...
.
তিনি কোনো সাধারণ যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তির সন্তান, যার নাম ইসলামের ইতিহাসে অহংকার, অবিশ্বাস ও শত্রুতার প্রতীক হয়ে আছে। তিনি ছিলেন আবু জাহলের পুত্র—ইকরিমা ইবন আবি জাহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
.
একসময় তিনি বদর, উহুদ, খন্দক—একের পর এক যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। মুসলিমদের ধ্বংস করাই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু আল্লাহ যখন কোনো হৃদয়কে হিদায়াতের আলোয় আলোকিত করেন, তখন সেই হৃদয়কে আর কেউ অন্ধকারে ফিরিয়ে নিতে পারে না।
.
মক্কা বিজয়ের পর ইকরিমা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। সেই দিন থেকেই তাঁর জীবনের দিক বদলে যায়। অতীতের প্রতিটি ভুলকে তিনি তাওবা, ঈমান ও আত্মত্যাগ দিয়ে মুছে দিতে চেয়েছিলেন। ইসলামের জন্য তিনি এমনভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন যে, একসময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিরুদ্ধে যে তলোয়ার উঠেছিল, আজ সেই তলোয়ারই ইসলামের পতাকা রক্ষায় ঝলসে উঠছে।
.
ইয়ারমুকের সেই রক্তাক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত "কে আছে, আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নেবে?"—এই আহ্বান ছিল শুধু যুদ্ধের ডাক নয়; এটি ছিল একজন তাওবাকারী মুমিনের ঘোষণা, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, আল্লাহর পথে ফিরে আসা মানুষ অতীতের অন্ধকারকে পেছনে ফেলে ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রে পরিণত হতে পারে।
.
.
কি ঘটেছিল বাইআতুল মাওতের পর?
.
ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে, প্রায় চার শতাধিক যোদ্ধা ইকরিমা (রা.)-এর হাতে এই অঙ্গীকার করেন। তারা প্রতিজ্ঞা করেন, “আজ হয় বিজয়, নয় শাহাদাত—ফিরে আসার জন্য আমরা অঙ্গীকার করিনি।” এ সময় ইকরিমা (রা.) তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলেছিলেন—
"আমি বহু যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আজ কি রোমানদের সামনে থেকে পালিয়ে যাব? আল্লাহর কসম! তা কখনো হবে না।"
.
এরপর তিনি ও তার সঙ্গীরা শত্রুর সবচেয়ে কঠিন অংশের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাদের এই আত্মোৎসর্গী আক্রমণ রোমানদের অগ্রযাত্রা মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেয়। সেই ক্ষণিক বিরতিই মুসলিম বাহিনীকে পুনরায় সারিবদ্ধ হওয়ার অমূল্য সুযোগ এনে দেয়। বদলে যায় যুদ্ধের গতি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ মুসলিমদের এমন এক বিজয় দান করেন, যা শামের ইতিহাসই বদলে দেয়।
.
.
মৃত্যুর মুখেও অটুট ভ্রাতৃত্ব...
.
শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ইকরিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অসংখ্য আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন চাচা আল-হারিস ইবন হিশাম (রা.) এবং আরেক বীর সাহাবি আইয়াশ ইবন আবি রাবীআহ (রা.)। তিনজনই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তাদের ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছিল।
.
এমন কঠিন মুহূর্তে একজন সৈনিক সামান্য পানি নিয়ে এগিয়ে এল। প্রথমে পানি দেওয়া হলো ইকরিমা (রা.)-কে। ঠিক তখনই তিনি মারাত্মক আহত হারিস (রা.)-এর কাতর শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ইশারায় বললেন—"আগে তাকে দাও।"
.
পানি নিয়ে যাওয়া হলো হারিস (রা.)-এর কাছে। কিন্তু তিনিও দেখলেন, আইয়াশ (রা.) আরও বেশি কষ্টে আছেন। তিনিও বললেন—"আগে তাকে দাও।"
.
পানি পৌঁছাল আইয়াশ (রা.)-এর কাছে। তিনি পানি পান করার আগেই দেখলেন, অন্য দুজনের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। তিনি আবার ইশারা করলেন—"আগে তাদের কাছে ফিরে যাও।"
.
এসময় সৈনিক দ্রুত ইকরিমা (রা.)-এর কাছে ফিরে এলেন। কিন্তু...ততক্ষণে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এরপর উক্ত সৈনিক দ্রুত হারিস (রা.)-এর কাছে ছুটে এলেন। দেখলেন তিনিও শাহাদাত বরণ করেছেন। শেষে তিনি আইয়াশ (রা.)-এর কাছে পৌঁছালেন। দেখলেন তিনিও আর দুনিয়ায় নেই। এক ফোঁটা পানিও কেউ পান করেননি। তিনজনই নিজের প্রয়োজনের আগে ভাইয়ের প্রয়োজনকে স্থান দিতে গিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন।