হামাস যে অস্ত্র সমর্পন করতে রাজি হয়েছে, সেটা শর্তসাপেক্ষ। শর্ত হচ্ছে, ইসরায়েলকে আগে সীজফায়ারের শর্তগুলো মানতে হবে।
তাদেরকে বর্তমানের ৭০% গাযার দখলদারিত্ব ছেড়ে ইয়েলো লাইনের ৫৩% এলাকায় ফিরে যেতে হবে। তাদেরকে দিনে ৬০০ ট্রাক করে ত্রাণ পাঠানোর যে শর্ত ছিল, সেটা পূরণ করতে হবে।
এগুলো করলেই হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র জমা দিতে শুরু করবে। কিন্তু সেটাও ইসরায়েলের কাছে না, বা বিদেশী কোনো বাহিনীর কাছে না। বরং ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কমিটির কাছে।
ঐ ন্যাশনাল কমিটিই গাযা পরিচালনা করবে। তারা পুলিশ বাহিনী নিয়োগ করবে। ভারী অস্ত্রগুলো জমা রেখে পুলিশকে রেগুলার অস্ত্র ব্যবহার করতে দিবে।
ইসরায়েল অলরেডি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এই সুযোগও দিতে রাজি না। ৫৩% এলাকায় ফিরে যেতে রাজি না। ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশ করতে দিতে রাজি না। সুতরাং আপাতত হামাসও অস্ত্র জমা দিচ্ছে না।
কিন্তু তারপরেও হামাস যে শর্ত সাপেক্ষে ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়েছে, ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ শাহাদার ভাষায় এটাই তাদের পক্ষ থেকে "বিশাল কম্প্রোমাইজ"। এর আগে হামাস কখনোই এত সহজে অস্ত্র সমর্পনে রাজি হওয়া তো দূরের কথা, এরকম প্রস্তাব আমলেই নেয়নি।
হ্যাঁ, হামাস দীর্ঘদিন ধরে গাযার শাসনভার ছেড়ে দিতে আগ্রহী ছিল। সেটা এমনকি ৭ অক্টোবরের আগে থেকেই। আমার বইয়ে আমি এটার উপর বিস্তারিত লিখেছে।
গাযা শাসন করাটা ছিল হামাসের জন্য একটা ট্র্যাপ। তারা দীর্ঘদিন ধরে সেই ট্র্যাপ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ফাতাহ'র সাথে নেগোশিয়েশন করে ঐক্যমতের সরকার গঠন করতে, বা সমঝোতার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফাতাহর মধ্যেই মাহমুদ আব্বাসের বিরোধী কোয়ালিশনের হাতে ক্ষমতা দিতে রাজি ছিল।
কিন্তু ইসরায়েলই তাদেরকে সেই সুযোগ দেয়নি। প্রতিটা নেগোশিয়েশন, প্রতি নির্বাচনের সম্ভাবনা ইসরায়েল নস্যাৎ করে দিয়েছে। কারণ তারা চেয়েছে হামাস গাযার শাসনকার্যের মধ্যেই আটকে থাকুক, অবরোধের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শাসন করতে গিয়ে আরও জনপ্রিয়তা হারাক, এবং বৃহত্তর সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ না পাক।
হামাস যে অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড পরিচালনা করেছিল, এটা ছিল মূলত তাদের এই ট্র্যাপ থেকে, এই খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসার অন্তত ১০ বছরের সংগ্রামের সর্বশেষ ধাপ।
কিন্তু গাযার শাসন ছেড়ে দিতে চাইলেও যেটাতে হামাস কখনোই রাজি হয়নি, সেটা হচ্ছে অস্ত্র সমর্পণ করা। তাদের অবস্থান ছিল, অস্ত্রও তারা সমর্পণ করবে, কিন্তু সেটা পিএলও'র পুনর্গঠনের পর, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা ঐক্যমতের সরকার গঠনের পর।
ফিলিস্তিনি জনগণ যদি সত্যিকার অর্থেই তাদের প্রতিনিধি বাছাই করার সুযোগ পায়, তাহলে যেই সরকার আসবে, সেই সরকার যখন প্রপার সেনাবাহিনী গঠন করবে, তারাই যখন গাযাকে রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবে, হামাসের সদস্যরা যখন সেই বাহিনীতে ইন্টিগ্রেটেড হতে পারবে, তখন আর তাদেরকে পৃথকভাবে সশস্ত্র বাহিনী মেইন্টেইন করতে হবে না।
কিন্তু সেটা যেহেতু কখনও হয়নি, তাই হামাসও কখনও অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়নি। এবারই প্রথম তারা সত্যিকার অর্থে এত বড় ছাড় দিলো।
মূলত বিশ্ব বাস্তবতা, গাযাবাসীর হতাশা, আরব রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে কাতfর, মিসর এবং তুরস্কের চাপ, সেই সাথে হয়তো কিছুটা আশ্বাস, এবং সেই সাথে হয়তো ইরানের নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে হামাসকে ত্যাগ করা - সব মিলিয়েই হামাস এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও ইসরায়েলের কট্টর অবস্থানের কারণেই এই সিদ্ধান্তে এই মুহূর্তে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম, বাট তারপরেও গাযার ইতিহাসে এটা একটা মেজর শিফট তো বটেই।
- Toha