অন্যের দয়াদাক্ষিণ্যে হবে না; ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই গুণ আপনার লাগবে…….
সহিহ বুখারিতে সাহল ইবনু সাদ রা. থেকে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটা যদিও ইমাম বুখারি, নামাজে সতর্ক করা প্রয়োজন হলে কী করণীয়, এসম্পর্কে এনেছেন, কিন্তু সচেতন পাঠকের জন্য এতে রয়েছে প্রয়োজনীয় শিক্ষা।
মদিনায় নবিয়ে আকরাম সা.-এর কাছে খবর এলো, কুবায় আমর বিন আউফ গোত্রের লোকেরা পারস্পরিক বিবাদে জড়িয়েছে। মুসলমানরা তখন সবেমাত্র নবিজির সাহচর্যের বরকতে জাহিলি যুগের গোত্রান্ধতা ও স্বজনপ্রীতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটনাটা ঘটে। বিবাদটা মৌখিকের সীমা অতিক্রম করে হাতাহাতি, মারামারি ও ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। খবর মদিনায় পৌঁছুতেই নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৌড়ে বের হন এবং সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে যান। বিবাদ মীমাংসা করতে করতে আসরের ওয়াক্ত হয়ে যায়। এদিকে আসরের সময় চলে যাচ্ছে দেখে বেলাল রা. আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, আপনি কি আজকের ইমামতিটা করবেন? আবু বকর রা. উত্তর দেন, তুমি যদি বলো, তাহলে করতে পারি। অতঃপর বেলাল রা. আযান দেন এবং আবু বকর রা. মসজিদে নববিতে সাহাবিদের নিয়ে আসরের নামাজ শুরু করেন।
হাদিসটা আরও দীর্ঘ; কিন্তু আমাদের উদ্দীষ্ট অংশ এটুকুই। এই হাদিসে একজন রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুরী ও কর্মতৎপরতা ফুটে উঠেছে। মদিনা থেকে কুবা প্রায় পাঁচ কিলো (কমবেশী হতে পারে)। বিবাদের খবর শোনামাত্র, জোহরের পরের যেসময়টাতে আমরা আয়েশ করে ভাতঘুম দিই, নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে ছুটেছেন পায়ে হেঁটে, কুবার পথে। উদ্দেশ্য, কুবায় অবস্থানকারী সাহাবিদের বিবাদ মেটানো। এবং এই কাজে এতোটা দেরী হয়ে গিয়েছিল যে মসজিদে নববিতে আসরের নামাজ দেরীতে শুরু করতে হলো, তাও নবিকে ছাড়া। একজন রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাদের, জনগনের বিবাদ মেটানোর জন্য স্বশরীরে উপস্থিত, দুপুরের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে, এটা কি আমাদের দেশ ও রাষ্ট্রে কল্পনীয়? আমাদের সোনার দেশে তো সামান্য জমিজমার বিবাদ মেটাতেই হায়াত ও সম্পদের শ্রাদ্ধ করতে হয়। হাদির মত জনপ্রিয় ব্যক্তিকে দিনেদুপুরে হত্যা করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেঁয়াজের দাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান। ‘লিডার’ খ্যাত ব্যক্তিরা বুলেটপ্রুফ দামি গাড়িতে এসির বাতাস খেতে খেতে জনগণের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন। ক্ষমতাধরদের নাগাল পেতেই আপামর জনতার নাভিশ্বাস উঠে যায়। বড় কোনো ঘটনায় এসি রুম ত্যাগ করে অকুস্থলে আসতে হলে কর্তাদের কপালে থাকে সাড়ে তিন ভাঁজ। তুমুল বিরক্তি নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, অত অস্থির হবেন না, আমরা বিষয়টা দেখছি। এবং সেই দেখার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতিহারের মতই অপূর্ণ থেকে যায়।
এটা তো সাধারণ রাজনীতিবিদদের অবস্থা; যারা কুরআন-সুন্নাহর আলেম ও রাজনীতিবিদ তাদের অবস্থা কল্পনা করুন। বিবাদ-ঝগড়া থেকে তিনি বা তারা থাকেন শত ক্রোশ দূরে। নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন তাদের। আয়েশ করে পান চিবুতে চিবুতে তিনি মন্তব্য করেন, ইলম থাকলে এসমস্ত জাহালাত কখনোই হতে পারতো না। সমাজ ও জনতা থেকে তারা এতো দূরত্বে অবস্থান করেন যে, বিয়ে-তালাক, ইসলামি নাম, আকিকা, সুন্নতে খাৎনার প্রয়োজন ব্যতীত সামাজিক ও জৈবনিক কোনো প্রয়োজন নিয়ে তাদের কাছে যাওয়া যায়, মানুষ ভাবতেও পারে না। মহাসড়কে আন্দোলনে তারা তখনই নামেন যখন ইসলাম ও মুসলমান হুমকির মুখে পড়েন, আমরা এটাকে অপ্রয়োজনীয় বলছি না, কিন্তু জনতার প্রয়োজন নিয়ে মাঠের আন্দোলনে তারা অনুপস্থিত। একটা বাম সংগঠনও যখন দ্রব্যমূল, জলবায়ু সমস্যা, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে মাঠে সরব, আলেম রাজনীতিবিদরা তখন সম্পূর্ণ নিরব। টুকটাক কেউ যদি আন্দেলন করেন তো সেটার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। কারও নিজের ভক্ত-মুরিদ, মুহিব্বিন-মুতাআল্লিকিনের মধ্যে সীমিত। কারও সীমিত সরকার পতনের আন্দোলনের মধ্যে। এই সত্য স্বীকার করে নেওয়া অনিবার্য। পীর-শায়েখদের ক্ষেত্রে এই ‘ছবি’ ব্যাখ্যাসমেত গ্রহণযোগ্য হলেও একজন রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে কেবল অগ্রহণযোগ্য নয়; এটা মস্ত বড় ত্রুটি। এই ত্রুটি দূর করতে না পারলে ভোট পাওয়া তো দূর, জনসাধারণের নেতৃত্বের কল্পনাই বদলানো যাবে না। আমাদের আলেম রাজনীতিবিদদের অধিকাংশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে ‘হ্যালিউসিনেশান’-এর ওপর। দুপ করে কোনো কারামাত ঘটে যাবে আর লোকজন তাদের রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মেনে নেবেন।