২রা আগস্ট ২০২৪ তারিখে কি সত্যিই বিদ্রোহের পরিকল্পনা হইছিলো?
হ্যাঁ, সেদিন সত্যিকার অর্থেই একটি ক্যু এর পরিকল্পনা ছিল। তবে সেটা নাহিদ ইসলাম বর্ণিত ক্যু না (যার নের্তৃত্বে ছিল কিনা জুলকারনাইন সায়ের সামি!)।
বরং সেই ক্যু ছিল সেনাপ্রধান ওয়াকারকে ফেলে কট্টর হাসিনাপন্থী এক জেনারেলের আর্মি চীফ হয়ে আন্দোলন কঠোর হস্তে দমানোর উদ্দেশ্যে।
বলা চলে, এটা একপ্রকার জঙ্গলের দুই নেকড়ের লড়াই এবং সেখানে দূর দূর অব্দি সামির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
ঘটনার শুরু হয় ১৯ জুলাই, ২০২৪ হতে; যেদিন থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি হয় এবং সেনাবাহিনী ডেপ্লয়েড হয়। সেনাবাহিনী ডেপ্লয়েড হওয়ার ৪/৫ দিনের মাথায় ২১ তারিখ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান অফিসার্স এড্রেস জয়েন করে আন্দোলনকারীদের দমাতে কড়া ভাষায় হুঙ্কার দেয় (মাত্রাধিক ক্ষয়ক্ষতির আগ অবদি আইনানুসারে ঐ মুহুর্তে বাধ্য ছিলো হুঙ্কার দিতে)।
অফিসার্স এড্রেসে সেনাপ্রধানের কড়া নির্দেশ মোতাবেক সারাদেশেই পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, সেনাবাহিনীর ব্যাপক গুলিবর্ষণে যখন লাশের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর ব্রুটালি ম্যাসাকার শুরু হয়, তখন ২৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের নিকট রিজাইন লেটার সাবমিট করেন।
দেশব্যাপী কারফিউ জারির প্রথম দিন হতেই আর্মি হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম ওপেন করা হয়; যেটা কেবলমাত্র যুদ্ধকালীন মুহূর্তে ওপেন হওয়ার কথা সেটা আন্দোলন দমাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। প্রতিদিন সেখানে ব্রীফ করত হাসিনার ল্যাসপেন্সাররা। আর্মি হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম ব্যতীত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায়ও মিটিং হতো। সেখানে জয়েন করা ব্যক্তিদের মাঝে উল্লেখযোগ্য: মেজর জেনারেল জোবায়ের, জিয়াউল আহসান এবং অন্যান্যরা।
তো প্রতিদিনের অপারেশনের রিপোর্ট সাবমিট এবং পরের দিনগুলোর অপারেশনের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরী হতো আর্মি হেডকোয়ার্টারের অপ্স রুম থেকে।
৩১ জুলাই, ২০২৪
পুলিশ আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন দ্বিতীয়বারের মত রিজাইন লেটার সাবমিট করেন এবং এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নিকট। তার ভাষ্যমতে প্রচুর পরিমাণ প্রাণহানি হচ্ছে যার ফলাফল কোনোভাবেই ভাল হবে না। কিন্তু তার সাগরেদরা তাকে কিলিংয়ে সম্মতি জানাতে কনভিন্স করতে শুরু করে।
৩১ তারিখ রাতেই অথবা ১লা আগস্ট- জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় আইজিপি মামুনকে কনভিন্স করার জন্য। জিয়াউল আহসান তাকে বোঝায়: "মামুন ভাই, ডোন্ট ডু দ্যাট"
২রা আগস্ট, ২০২৪
প্রতিদিনকার মতই আর্মি হেডকোয়ার্টার অপারেশন্স রুমে কার্যক্রম চলমান। সবাইকেই দেখা যাচ্ছে কিন্তু একজন নেই। সেই ব্যক্তি হলেন: আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন। মুহূর্তেই বেঁকে বসলেন অন্যান্যরা। তাদের মাঝে জিয়াউল আহসান ও ডিজি এসএসএফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব অন্যতম। তাদের অভিযোগ: জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের লীডারশিপ ভালো না। তিনি তার কোরামকেই কন্ট্রোল করতে পারছেন না, আন্দোলন কিভাবে কন্ট্রোল করবেন.? সো ওয়াকার মাস্ট গো।
জিয়াউল আহসান দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে। বললেন: "ম্যাডাম, চীফ কন্ট্রোল করতে পারছেন না, আপনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবকে কন্সিডার করুন। হি হ্যাস দ্যা ক্যাপাবিলিটি”
অর্থাৎ ওয়াকারকে সরিয়ে মুজিবকে সেনাপ্রধান করার পরিকল্পনা।
প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ছিল: “আমি আগামীকাল বিষয়টা দেখছি। আর আন্দোলন দমন করতে যত প্রয়োজন লাশ ফেলো। গুলির হিসাব হবে, লাশের হিসাব হবেনা"
প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন সিগ্ন্যাল পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিব এবং জিয়াউল আহসান সেনাপ্রধান ওয়াকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা করে। এজন্য জিয়া সাহায্য চান ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরান হামিদের নিকট। হামিদকে বলা যায় দুটো কোম্পানি প্রস্তুত রাখতে। কথামত হামিদ তার অধীনস্থ ইউনিট গুলোকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু এর মধ্যে কোনো এক ইউনিটের সিও (কমান্ডিং অফিসার) বিষয়টি সম্পর্কে জেনারেল ওয়াকারকে অবগত করেন।
২রা আগস্ট, রাত ৮:৩৫
আর্মি হেডকোয়ার্টার অপারেশন্স রুম থেকে জেনারেল ওয়াকার উজ জামান উঠে বেরিয়ে যান এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেই বসবাসরত তার এক কোর্সমেট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মতিউরের বাসায় পরদিন সকাল ৮:০০টা অব্দি অবস্থান করেন।
এর মধ্যেই রাত দশটার পর জিয়াউল আহসান এবং জেনারেল মুজিব দুটি সাবমেশিনগান হাতে অপারেশন্স রুমে ঢুকে পড়ে কিন্তু জেনারেল ওয়াকারকে আর পায়না। পরবর্তীতে তারা ফিরে যায়।
আসল কথা হলো: জেনারেল ওয়াকার সিচুয়েশন যেভাবে হ্যান্ডেল করছিলেন (রক্তপাত না ঘটাতে/নিয়ন্ত্রণে আনতে) তা পছন্দ ছিল না জিয়া মুজিবের। তারা আরো ম্যাস কিলিং চাচ্ছিলেন। সুতরাং এখানে লড়াইটা দুই নেকড়ের ছিল আর এখানে সামির সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা। যে ব্যক্তি সামিকে উক্ত ক্যু'র ব্রেইনচাইল্ড বানাতে চেয়েছে, হয় সে বোকা নয় সে ধুরন্ধর।
~ শাফিন রহমান (সাবেক সেনা কর্মকর্তা)
(ঈষৎ পরিমার্জিত)