রংপুরে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের হত্যাকান্ড ধামাচাপা দিতেই সাগর-রুনিকে ফের খুন করালো বিএনপি-জামাত গং!
একটা ভাঙা টেপ রিওয়াইন্ড করে বারবার শোনানো হচ্ছে। প্রতিবারই সেই এক সুর, সেই এক অভিনয়, সেই এক নির্লজ্জ পালা। অথচ পর্দার আড়ালে যা ঘটছে তা এতটাই সস্তা আর গলদে ভরা যে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে চরমভাবে অপমান করা ছাড়া আর কিছুই নয়। রংপুরে হিন্দু পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যখন গোটা দেশ থরথর করে কাঁপছে, যখন প্রতিটি মানুষ এই জঘন্য হত্যার বিচার চাইছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চে হাজির হলো নতুন এক পুরনো নাটক। নাম তার সাগর রুনি হত্যারহস্য।
যে মামলা এতদিন ধরে ফাইলবন্দি হয়ে ধুলো খাচ্ছিল, যে মামলার তদন্তে এতদিন কেবল কালক্ষেপণ আর প্রহসন চলেছে, সেই মামলাকেই এখন হঠাৎ করে টেনে আনা হলো আলোচনার কেন্দ্রে। অথচ সময়টা মোটেই আকস্মিক নয়। যে মুহূর্তে রংপুরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ দানা বাঁধছে, যে মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে এই হত্যার পেছনে কারা, যে মুহূর্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই সাগর রুনি মামলায় এক নাটকীয় মোড় আনার চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে নতুন কারও নাম, জড়ানো হচ্ছে এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে। অথচ এই অভিনেত্রীকে এই মামলায় জড়ানোর মতো কোনো যুক্তিই খুঁজে পাওয়া যায় না। যাঁর নিজের পরিবার তখন টানাপোড়েনের মধ্যে, যিনি তখন কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মীও নন, তিনি কীভাবে আর কেনই বা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত হবেন, সেটা ভাবারও প্রয়োজন নেই। কারণ যাঁরা এই গল্প বানাচ্ছেন তাঁরা নিজেরাই জানেন এটা সাজানো, নিজেরাই জানেন এটা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল।
নিহত সাংবাদিক সাগর সরোয়ারের মা সালেহা মনিরের কথাটাই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে। তিনি নিজেই বলেছেন, তাঁর ছেলের সঙ্গে কোনো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সম্পর্ক ছিল না। তাহলে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে এনে এই হত্যার সঙ্গে জড়ানোর অর্থ কী? এটা কি তবে হত্যার আসল রহস্য উদঘাটন, নাকি রহস্যকে আরও গভীরে চাপা দেওয়ার চেষ্টা? যিনি সন্তান হারিয়েছেন, যিনি মৃত্যুর আগে শুধু জানতে চান কারা তাঁর ছেলেকে খুন করেছে, তাঁর কণ্ঠেও সেই অনুরণন স্পষ্ট, কোনো নিরীহ মানুষ যেন এই মামলায় বলির পাঁঠা না হয়। কিন্তু এই আর্তিটুকুও কি শোনার মানুষ আছে?
সাগর রুনি হত্যার সময়রেখাটা একটু মিলিয়ে দেখলেই চোখে পড়ে পুরো ঘটনা কতটা অসংলগ্ন। পিলখানা বিদ্রোহের সময় এই দম্পতি ছিলেন জার্মানিতে। সেখানে সাগর সারোয়ার ডয়চে ভেলের হয়ে কাজ করতেন। প্রায় তিন বছর বিদেশে থাকার পর তাঁরা দেশে ফেরেন ২০১১ সালের জুনে। এরপর সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনে বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন, রুনি যোগ দেন এটিএন বাংলায়। মাত্র সাত মাসের মাথায় দুজনকেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়। এই সাত মাসে তাঁরা কী এমন দেখে ফেললেন, কী এমন তথ্য পেয়ে গেলেন যে তাঁদের এভাবে শেষ করে দিতে হলো? নাকি কোনো পক্ষ চায় না এই প্রশ্নের উত্তর কেউ খুঁজে বের করুক?
যে প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবে আসার কথা সেই প্রশ্নগুলোকে চাপা দিতে চালু হলো উল্টো পথে হাঁটা। পিলখানার ঘটনার সময় যাঁরা দেশেই ছিলেন না তাঁদের হত্যার পেছনে পিলখানার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে রোকেয়া প্রাচীর তখনকার জীবনের মূল লড়াইটা ছিল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, যে সময়ে তিনি সংসার আর বিচ্ছেদের টানাপোড়েনে জর্জরিত, তাঁকে বসানো হচ্ছে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের কাণ্ডারি হিসেবে। এই গল্প বিশ্বাস করার মতো সরল মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। কিন্তু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সত্যকে এভাবে বিকৃত করার চেষ্টা যে কতটা নিচে নামতে পারে, এই ঘটনা তার প্রমাণ।
এরপরও কেউ যদি প্রশ্ন করেন, তাহলে কেন এখন এই নাটক? উত্তরটা খুবই সহজ। রংপুরের হিন্দু পরিবার হত্যার ঘটনায় যখন প্রশাসনের ব্যর্থতা আর জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘিরে চারদিকে চাপ বাড়ছে, তখন মনোযোগ সরাতে দরকার একটি চমকপ্রদ গল্প। সাগর রুনি হত্যাকাণ্ড বহু বছর ধরে অমীমাংসিত, ফলে এই মামলাকে ব্যবহার করে ইচ্ছামতো নাটক সাজানো সহজ। যাঁরা ক্ষমতায় বসে আছেন তাঁদের স্বার্থই হলো এমন বিভ্রান্তি তৈরি করা, যাতে জনগণ আসল প্রশ্ন ভুলে যায়। রংপুরের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রক্ষা করতে না পারলেও অন্তত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে দেওয়া গেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে।
এই সরকারের আমলে আইন আদালত যে দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে, তা আর কারও অজানা নয়। তদন্তের নামে যা চলছে তা নিছক মঞ্চায়ন। আসল দোষীদের ছাড় দিয়ে নির্দোষ মানুষের নাম টেনে আনার এই রাজনীতি একসময় জনগণই প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ সত্য চাপা থাকে না। সাগর-রুনির মায়েদের মতো সারাদেশের জনগণো আজ জানতে চায় আসল খুনি কে! সে উত্তর যতদিন না মিলবে, ততদিন এই ধরনের মঞ্চায়ন কেবল সাময়িক ঢাকঢোল বাজাতে পারে, কিন্তু চিরদিনের জন্য জনগণকে বোকা বানিয়ে রাখতে পারবে না।
23
7
4September 2, 2026 2.2K 1