দেশে বর্তমানে আন-অফিসিয়াল মোবাইল ফোন বন্ধ করার ব্যাপারে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। বাহ্যিকভাবে এই পদক্ষেপকে কেবল ট্যাক্স আদায় বৃদ্ধি এবং দেশীয় মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য প্রচার করা হলেও, এর আড়ালে আরও সুদূরপ্রসারী সরকারি পরিকল্পনা রয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
সম্প্রতি, সরকারের একজন উপদেষ্টা সরাসরি সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন যে সরকার অনুমোদিত সংস্থা ফোনে আড়ি পাততে পারবে। এই আড়ি পাতার প্রক্রিয়াটি কার্যকর করার জন্য একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হলো: নির্দিষ্ট সরকারি সফটওয়্যার ফোনগুলোতে ইনস্টল করা। আর এই পদক্ষেপ কার্যকর করার জন্য ফোনগুলোকে অবশ্যই অফিসিয়াল বা অনুমোদিত হতে হবে, কারণ সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই ফোন কোম্পানিগুলো অনুমোদিত ডিভাইসে সফটওয়্যার দিতে বাধ্য থাকবে।
এই পদ্ধতি গ্রহণের পক্ষে দুইটা উদাহরণ দেখা যেতে পারে, বিজয় কীবোর্ড চুক্তি: পূর্ববর্তী দেশদ্রোহী সরকারের সময়ে ফোন কোম্পানিগুলোর সাথে সকল অফিসিয়াল ফোনে বিজয় কীবোর্ড ইনস্টল করে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। দেশে ফোন আনুষ্ঠানিকভাবে রিলিজ করার ক্ষেত্রে বিজয় কীবোর্ড ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক ছিল।
সঞ্চার সাথী অ্যাপ: আরেকটি উদাহরণ হলো ভারতের ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশন (DoT) সম্প্রতি ফোন কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনা করেছে যে, এখন থেকে সকল নতুন ফোনে 'সঞ্চার সাথী' অ্যাপটিকে সিস্টেম অ্যাপ হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে ইনস্টল করে দিতে হবে, যা ব্যবহারকারী যেন কোনোভাবেই আনইনস্টল করতে না পারে। যদিও DoT এই উদ্যোগের কারণ হিসেবে মূলত ফোন চুরি হওয়া রোধ বা সহজে উদ্ধারের ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে, তবে দেখা গেছে এই অ্যাপটি ব্যবহারকারীর প্রায় সকল ধরনের বিষয়াদি অ্যাক্সেস ও মডিফাই করার মতো অনুমতি নিয়ে রাখে। এর মধ্যে রয়েছে সকল ফোন কল এবং এসএমএস মনিটরিং, সর্বদা ক্যামেরা অ্যাক্সেস (মানে ছোটো খাটো একটা সিসি ক্যামেরা।) ফাইল, ছবি, এবং ভিডিও অ্যাক্সেস ও মডিফাই করার ক্ষমতা। এর ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
ভারতে এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেও, অনেকে ভাবতে পারেন দেশে তো সরাসরি এখনই এই পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু এখনই এমন কিছু শুরু হয়নি বলে ভবিষ্যতেও হবে না, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বরং এর উল্টোটিই আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ ভারতের এই পদক্ষেপগুলোর বর্তমান পর্যন্ত চালু হওয়ার সাথে বাংলাদেশের কার্যকারিতার একটা মিল পাওয়া যায়। যেমন, সিম লিমিট করে দেয়া, আন-অফিসিয়াল ফোন বন্ধ করে দেয়া। এবং সর্বশেষ ভারতের অ্যাপ চুক্তি যেটা ভিন্ন অ্যাপের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো আগেই করে ফেলেছে। এবং তখন ইসরায়েল থেকে নজরদারী প্রযুক্তি কিনেছে বলে নিউজও হয়েছিল। তবে সম্ভবত সেই সফটওয়্যার চুক্তি এখন নেই তবে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে নতুন নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন চুক্তি হতে বেশি সময় লাগবে না বলেই অনুমেয়।
সরকার অবশ্যই দেশের রাজস্ব বাড়াতে (ট্যাক্স) এবং জনগণের ফোনের নিরাপত্তা দিতে চাইতে পারে। তবে নাগরিকের সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা কোনোভাবেই একটি সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিজের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার এবং তা সুরক্ষিত রাখার অধিকার থাকা উচিত। এবং সরকারের এমন কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয় যে নিরাপত্তা বা অন্যান্য অজুহাত দেখিয়ে সবার ঘরে ঘরে চার-পাঁচটা করে সিসি ক্যামেরা ইনস্টল করবে।
পরিশেষে দেশের সুনাগরিক হিসাবে আমরা বিশ্বাস করি নিজের গোপনীয়তার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। উত্তর কোরিয়ার (যেখানে নাগরিকের কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছু নেই বলে প্রসিদ্ধ) মতো আমাদেরও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেন ক্ষুণ্ন না হয় তার জন্য অধিকার হিসাবে আগে থেকেই বুঝতে ও অনুধাবন করতে হবে।
উল্লেখ্য : এখানে সরকার বা দেশ বিরোধী কোনো থিউরি প্রচার করা হচ্ছে না। সার্বিক অবস্থার ভিত্তিতে নিজের উদ্বিগ্নতা ও সকল নাগরিক নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে মাত্র। আমরা আশা রাখি আমাদের দেশে উত্তর কোরিয়া বা ভারতের মতো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে না।