তাওহীদ বনাম শিরক, ঈমান বনাম কুফর, ইসলাম বনাম জাহেলিয়াত—এটিই মানব ইতিহাসের প্রধান দ্বন্দ্ব। নবীদের (আলাইহিমুসসালাম) দাওয়াহ বারবার এই দ্বন্দ্বকেই সামনে এনেছে। এটি তাঁদের দাওয়াহর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, এবং বিশুদ্ধ তাওহীদের দাওয়াহর অনিবার্য উপসংহার।
.
নবীদের (আলাইহিমুসসালাম) দাওয়াহর আলোকে সমাজপরিবর্তনের কর্মপন্থা সাজাতে গেলে ঈমান বনাম কুফর, তাওহীদ বনাম শিরকের এই দ্বন্দকেই বানাতে হবে দাওয়াহর কেন্দ্র।
.
মহান আল্লাহই এই কেন্দ্র আমাদের জন্য ঠিক করে দিয়েছেন। নিজেদের পছন্দ মত যে কোন উত্তর বেছে নেয়ার ইখতিয়ার এখানে আমাদের নেই। বরং আমাদের দায়িত্ব হল বর্তমান বাস্তবতায় এই দ্বন্দ্ব কিভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সেটা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সমাজের সামনে তুলে ধরা।
.
বাস্তবতার আলোকে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমাদের সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব হল ইসলামী ব্যবস্থা এবং সেক্যুলার ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব। আল্লাহর আইন বনাম গায়রুল্লাহর আইনের দ্বন্দ্ব। এটিই আমাদের সময় এবং সমাজে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের চিরন্তন দ্বন্দের প্রধান ম্যানিফেস্টেশন।
.
রাজনৈতিক সঙ্কট, সামাজিক অবক্ষয়সহ প্রায় সব সংকট এই প্রধান দ্বন্দ্বের উপসর্গ। এই দ্বন্দের প্রভাবই ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মূল্যবোধ, বিচারব্যবস্থা, এমনকি আত্মপরিচয়ের তর্কের নানা স্তরে।
.
এটি নিছক কোন মতাদর্শিক বিরোধ না। কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, দ্বীনের দ্বন্দ্ব। এমন এক দ্বন্দ্ব যার সম্পর্ক মানব-অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোর সাথে।
.
মানব ইতিহাসের অর্থ কী?
মানবজীবনের উদ্দেশ্য কী?
ভালো কী?
মন্দ কী?
ভালো-মন্দের মাপকাঠি কোথা থেকে আসে?
বিধান কে দেবে?
আইনের ভিত্তি কী হবে?
সমাজের রীতিনীতি আর শাসনব্যবস্থার উৎস কী হবে?
সার্বভৌমত্ব কার? কর্তৃত্ব কার?
.
প্রত্যেক সমাজ আর সভ্যতাকে এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করতে হয়। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ঠিক করে সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ। আর এখানে ইসলাম এবং আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অবস্থান সাংঘর্ষিক।
.
আধুনিকতা মানুষকেন্দ্রিক। আধুনিকতা মানুষের বিবেককে মাপকাঠি বানায়। দুনিয়াকে চালাতে চায় মানুষের বানানো বাদ-মতবাদ দিয়ে।
.
ইসলাম বলে সবকিছুর কেন্দ্র হলেন আল্লাহ। তিনি একাই মালিক। তিনিই নৈতিকতা নির্ধারণ করেন, বৈধ আর অবৈধ ঠিক করেন, ইবাদাত ও আইন; সর্বক্ষেত্রে তিনিই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ।
.
আধুনিকতা আর ইসলাম, এই দুই দ্বীনের মধ্যে বিরাজ করে এক অনতিক্রম্য দূরত্ব। অমোচনীয় বৈপরীত্য। আর এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে কমপ্রিহেনসিভ ম্যানিফেস্টেশন হয় ইসলামী ব্যবস্থা আর সেক্যুলার ব্যবস্থারর মধ্যেকার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে।
.
ইসলামের আকিদাহ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, রূহানিয়াত এর মতো বিষয়গুলোর সামগ্রিক প্রকাশ ঘটে ঘটে ইসলামী ব্যবস্থার মাধ্যমে। পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ইসলামের বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
.
একইভাবে, পশ্চিমা সভ্যতার মৌলিক বিশ্বাস, মতাদর্শ, জীবনবোধ এবং জ্ঞানতত্ত্বের সার্বিক প্রকাশ ঘটে সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে।
.
আধুনিক তন্ত্রমন্ত্রগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অ্যাকাডেমিক আলাপ, তত্ত্বকথা কিংবা দার্শনিক প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয় না। সমাজে এগুলো কার্যকর থাকে শিক্ষা, আইন, শাসন, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে। এগুলো আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে কাঠামোগতভাবে। আর এ কাঠামোগুলোর বিরাট একটা অংশকে নিয়ন্ত্রন করে সেক্যূলার রাষ্ট্র।
.
সেক্যুলার ব্যবস্থাই ঐ প্রধান মাধ্যম যার মাধ্যমে আধুনিক জাহেলিয়াত আমাদের জীবনে কার্যকর হয়। সুতরাং, ইসলাম ও সেক্যুলার ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব কেবল মতাদর্শিক কিংবা রাজনৈতিক প্রশ্ন না, এটি সভ্যতার দ্বন্দ্ব, ওয়ার্ল্ডভিউয়ের দ্বন্দ্ব, আকীদাহর দ্বন্দ্ব।
- Asif Adnan