স্বাধীন বাংলার বেতারকেন্দ্র: post #4115 — TG.ME

১৯৬২ সাল। ভ্যাটিকান থেকে একটা গোপন নথি পাঠানো হলো পৃথিবীর সব বিশপের কাছে।

নাম—ক্রাইমেন সলিসিটেশনিস।

নথিটা বলছিল, কোনো যাজকের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সেই তদন্তের পুরো প্রক্রিয়াটা রাখতে হবে সর্বোচ্চ গোপনীয়তায়। অভিযোগকারী, সাক্ষী, তদন্তকারী, কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না।

তাই এই শপথ। চুপ থাকার শপথ। শপথ ভাঙলে শাস্তি ছিল চার্চ থেকে বহিষ্কার।

চার দশক পর, ২০০১ সালে, এই একই নিয়ম আরও কড়াভাবে পুনর্বহাল করেন কার্ডিনাল জোসেফ রাৎসিঙ্গার। যিনি পরে হয়েছিলেন পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট।

চার্চের আইনজ্ঞদের একাংশের দাবী, এই গোপনীয়তার পেছনে যুক্তি হল—সাক্ষীদের নিরাপদে কথা বলার সুযোগ, আর প্রমাণ হওয়ার আগে অভিযুক্তের সম্মান রক্ষা।

কিন্তু বাস্তবে?

এটা সেক্সুয়াল এবিউজের শিকার শিশুদের চুপ করিয়ে রাখতে, পুলিশকে দূরে রাখতে, অপরাধীকে বদলি করে আরেকটা প্যারিশে পাঠিয়ে দিতেই সাহায্য করত।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, প্রায় ষাট বছর পর, পোপ ফ্রান্সিস এই নিয়ম বাতিল করেন যৌন নির্যাতনের মামলার ক্ষেত্রে।

তাও সেটা বাধ্য হয়ে। কারণ, পৃথিবীর দেশে দেশে একে একে প্রকাশ পাচ্ছিল—এই গোপনীয়তার আড়ালে কী পরিমাণ নির্যাতনের ঘটনা একের পর একেই ঘটেই যাচ্ছে।



যুক্তরাষ্ট্রে ২০০২ সালে এর শুরু। বোস্টন গ্লোবের একটা সাংবাদিক দল একটা প্যারিশের এক যাজকের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুঁড়তে গিয়ে দেখল যেম খুবই ভয়ানক ঘটনা।

ছিল একটা প্যাটার্ন। অভিযোগ উঠতো। যাজককে চুপচাপ আরেক প্যারিশে বদলি করা হতো। সেখানে গিয়েও সে আবার একই কাজ করত।

কেসটার নাম জন গিহান।

বোস্টনের এই যাজক, তিরিশ বছরের ক্যারিয়ারে অন্তত ছয়টা প্যারিশে কাজ করেছেন। ১৯৮২ সালেই এক পরিবার বিশপের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিল তার বিরুদ্ধে।

১৯৮৪ সালে কার্ডিনাল বার্নার্ড ল—যিনি সেই বছরই বোস্টনের নতুন আর্চবিশপ হয়েছেন—গিহানকে সরিয়ে নিলেন একটা প্যারিশ থেকে, অভিযোগ পাওয়ার পরই।

কিন্তু বরখাস্ত করলেন না। দুই মাসের মধ্যে তাকে বসিয়ে দিলেন আরেকটা প্যারিশে, ওয়েস্টনের সেন্ট জুলিয়াস-এ, যেখানে তার হাতে তুলে দেওয়া হলো তিনটা যুব-সংগঠনের দায়িত্ব, তার মধ্যে অল্টার বয়দের দলও।

তিন সপ্তাহ পরই আরেক বিশপ লিখিতভাবে ল-কে সতর্ক করেছিলেন, এই বদলি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়ে।

গিহানকে অবশেষে বহিষ্কার করা হয় ১৯৯৮ সালে, প্রথম লিখিত অভিযোগের ষোলো বছর পর।

ততদিনে অন্তত ১৩০ জন মানুষ সামনে এসে বলেছেন, শিশু থাকাকালীন তারা তার হাতে নির্যাতিত হয়েছেন।

এই যাজকের হাতে যৌন শিকারদের একজনের বয়স ছিল মাত্র চার বছর।

ভাবতে পারছেন, ৪ বছরের শিশু থেকে শুরু করে এই বয়সী শিশুদের অন্তত ১৩০ জন তার হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার!



২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশপদের নিজেদের অনুরোধে জন জে কলেজের গবেষকরা একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

সংখ্যাগুলো ছিল এরকম, ১৯৫০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার ৬৬৭ জন শিকারের অভিযোগ, ৪ হাজার ৩৯২ জন যাজকের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ তৎকালীন মোট যাজকের প্রায় চার শতাংশ।

আর যারা এই এবিউজের শিকার, তাদের চল্লিশ শতাংশের বেশি ছিল এগারো থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া রাজ্য থেকে আরও ভয়ংকর তথ্য বের হয়। ছয়টা চার্চ-অঞ্চলে (ডায়োসিসে) নয় বছর ধরে তদন্ত চালায় একটা সরকারি তদন্তকারী দল (গ্র্যান্ড জুরি)। তারা পুরনো ফাইল আর গোপন নথি ঘেঁটে দেখে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, গত সত্তর বছরে অন্তত ৩০১ জন যাজক পরিকল্পিতভাবে শিশুদের যৌন নির্যাতন করেছেন। এই যাজকদের হাতে নথিভুক্ত শিকারের সংখ্যা অন্তত এক হাজার। তদন্তকারীরা বলেছিলেন, আসল সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ঘটনার কোনো নথিই রাখা হয়নি।

রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, প্যাটার্নটা ছিল সবসময় একইরকম—"নির্যাতন, অস্বীকার, আর ধামাচাপা।"

গ্র্যান্ড জুরির ভাষায়, চার্চের নেতারা বারবার নির্যাতনকে বর্ণনা করতেন "দুষ্টুমি" বা "অনুপযুক্ত আচরণ" বলে।

বাস্তবে সেটা ছিল ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ।



যুক্তরাষ্ট্র একা না।

২০২১ সালে ফ্রান্সে প্রকাশ পায় সোভে কমিশনের রিপোর্ট। আড়াই বছরের স্বাধীন তদন্তের ফল। সংখ্যাটা এত বড় যে বিশ্বাস করা কঠিন।

১৯৫০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ফরাসি ক্যাথলিক চার্চে অন্তত দুই লাখ ষোলো হাজার শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে যাজকদের হাতে। গির্জার সাথে যুক্ত অন্য কর্মী মিলিয়ে সংখ্যাটা দাঁড়ায় তিন লাখ তিরিশ হাজারে।

কমিশনের প্রধান বলেছিলেন, ২০০০ সাল পর্যন্ত চার্চের মনোভাব ছিল নির্যাতনের শিকারদের প্রতি " নিষ্ঠুর উদাসীনতা"। তাদেরকে বিশ্বাস করা হতো না, উল্টো তাদেরই দোষী ভাবা হতো।

২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল কমিশন জানায়, ১৯৫০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশটার সাত শতাংশ ক্যাথলিক যাজকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।
July 21, 2026 423 1