আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।
১৯৯০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘ভাষা দিবস’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ আলোচনা সভায় বক্তৃতাকালে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের এমপি এবং ভাষা সৈনিক আবদুল মোহাইমেন বলেন, ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের কাছে সাক্ষাৎকার দানকালে শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে ভুলক্রমে ফসকে যাওয়া একটি শব্দের জন্য দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিহতের সংখ্যা তিন লাখের স্থলে ৩০ লাখ হয়ে গেছে।
১৯৯০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক তারকালোকে আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মোহাইমেন একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে ঘোষণা দিয়েছি তাতে আমরা নিহতের সংখ্যা তিন লাখ ঘোষণা করেছিলাম এবং এই হিসাবও আমরা তখন কলকাতায় বসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে খবরাখবর নিয়ে একটি আনুমানিক সংখ্যা দাঁড় করিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে আমরা নিহতদের সংখ্যা নিরূপণের প্রয়াস পাই। তখন বৃহত্তর নোয়াখালীর মৃতদের সংখ্যা বের করার দায়িত্ব গণপরিষদের সদস্য হিসেবে আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করে যে সংখ্যা পেয়েছিলাম, সেটা সাত হাজারের কম। নিহত রাজাকারদের সংখ্যা ধরেও সাড়ে সাত হাজারের বেশি দাঁড়ায়নি। তখন বাংলাদেশে ঊনিশটি জেলা ছিল। সবকটি জেলায় যুদ্ধ সমভাবে হয়নি। যেসব জেলায় যুদ্ধের প্রকোপ বেশি হয়েছিল, তার মধ্যে নোয়াখালী ছিল একটি। তাই নোয়াখালী জেলার মৃতের সংখ্যা যা দাঁড়িয়েছিল, গড়ে ঐ সংখ্যাও যদি সব জেলায় ধরা যায় তাতেও লাখ সোয়া লাখের বেশি মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় না। কিন্তু ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান তিন মিলিয়ন বলে ফেলেন। তারপর থেকেই চালু হয়ে গেল ৩০ লাখ লোক মারা গিয়েছে। মুজিববাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর ভয়ে কেউ এ সংখ্যা শোধরাননি কিংবা প্রতিবাদ করেননি। এমন কি তখনকার সময় আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী জহিরুল কাইয়ুম একটি সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩ লাখ লোক নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা—কমীর্ প্রতিবাদ করেননি। ৩০ লাখ লোক যে মরেনি তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৭২ সালে সরকারের তরফ থেকে প্রতি নিহত জনের জন্য ২০০০ টাকা করে ঘোষণা করা হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যতটুকু জানা গেছে, মাত্র ৭২ হাজার দরখাস্ত পরেছিল। তার মধ্যে ৫০ হাজার নিহতের আত্মীয়দের ঘোষিত অর্থ দেয়া হয়েছে। এই ৭২ হাজারের মধ্যে আবার বহু ভুয়া দরখাস্তও ছিল এমনকি অনেক রাজাকারও ছিল।
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই ব্যারিস্টার শরৎ চন্দ্র বসুর নাতনি শর্মিলা বসু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আসলে কত লোক নিহত হয়েছে তা নির্ণয় করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চালান। তিনি তার লেখা ‘ডেড রেকনিং শিরোনামে গ্রন্থে বলেন, The number three million appears to be nothing more than a gigantic rumour. From the available evidence discussed in this study, it appears possible to estimate with reasonable confidence that at least 50,000-100,000 people perished in the conflict in East Pakistan/Bangladesh in 1971, including combatants and non-combatants, Bengalis and non-Bengalis, Hindus and Muslim, Indians and Pakistanis
অর্থাৎ তিন মিলিয়ন সংখ্যাটি একটি বিশাল গুজব ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে হচ্ছে। এই গবেষণায় আলোচিত প্রমাণ থেকে যুক্তিসঙ্গত অনুমান যে, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ লোক মারা গিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে সৈন্য এবং বেসামরিক লোক, বাঙালি ও অবাঙালি, হিন্দু ও মুসলমান, ভারতীয় ও পাকিস্তানি ছিল।
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর একটি দৈনিকের সম্পাদকীয়তে ৩০ লাখের উল্লেখ থাকায় পরীক্ষা—নিরীক্ষা ছাড়াই ‘ইউরেকা’ ‘ইউরেকা’ বলে একটি মহল লাফাতে শুরু করে। জানতে চেষ্টা করা হয়নি এই পত্রিকা এবং পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে কি ছিল। এই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘৩০ লাখ’ সংখ্যাটি নিয়ে যারা লাফালাফি শুরু করেন তাদের বিরুদ্ধে ৯ মাস পত্রিকাটি ‘বিশেষ ভূমিকা’ পালন করেছে। আলোচ্য পত্রিকার মালিকের নাগরিকত্ব পর্যন্ত মুক্তিযুুদ্ধের পরপর কেড়ে নেয়া হয়। এ মালিকের মালিকানাধীন পত্রিকার প্রিয়ভাজন সম্পাদক ৩০ লাখ সংখ্যাটি নিজের ৯ মাসের পাপ স্ফলণের জন্য উপহার দেন। আর আওয়ামী—বাকশালীরা এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত তা গ্রহণ করে নিলেন। সেই সময় থেকে শুরু হয় ৩০ লাখের উচ্চারণ। কেউ জিজ্ঞেস করেনি এবং জানতেও চায়নি এ সংখ্যাটি কোন ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়ে বাজারজাত হলো।
February 24, 2026 33